বিদেশে গমনেচ্ছু কর্মীদের আত্মসচেতন হতে হবে

| বৃহস্পতিবার , ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান সরকার মানবপাচার প্রতিরোধ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ২৬ অক্টোবর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার অফিসকক্ষে উইনরক ইন্টারন্যাশনাল’র গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ও সিইও মাকসোদা মাকসুদির সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকালে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ডিজিটাল এনআরএম প্ল্যাটর্ফম এবং মানবপাচারের শিকার ভিকটিমদের টেকসই পুনর্বাসন কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার মানব পাচারের শিকার ভিকটিমদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে জাতীয় রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম) এবং মানব পাচার প্রতিরোধ তহবিল কার্যকরভাবে পরিচালনা করছে। এ সংক্রান্ত এনজিও কার্যক্রম ও নতুন প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করছে। তিনি সামপ্রতিক সময়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নামে সাইবার স্পেস ও বিভিন্ন ভুয়া অনলাইন জব অফারের মাধ্যমে সংঘটিত জালিয়াতি ও মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান। উইনরক ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট মাকসোদা মাকসুদি বাংলাদেশে মানবপাচার প্রতিরোধে ২০০৮ সাল থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ এবং আসন্ন ২০২৬–২০৩০ মেয়াদের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনপিএ) বাস্তবায়নে উইনরক–এর পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

মানব পাচার বিশ্বব্যাপী একটি সমস্যা এবং একটি ঘৃণ্য অপরাধও বটে। পাচারের শিকার মানুষদের মানবাধিকার নানাভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রতিবছর পাচারের শিকার হয়ে সারা বিশ্বে অনেক মানুষের জীবনে সর্বনাশ ঘটছে। মানব পাচারের বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর আইন। তবু মানব পাচারে জড়িত দালাল চক্র রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নির্ধারিত দেশে পৌঁছার পর অথবা আগেই অপহরণ করছে। অমানুসিক নির্যাতনের পর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আদায় করছে মোটা অংকের মুক্তিপণ। বছরের পর বছর ধরে এই পুরো জালিয়াতি সংঘটিত হচ্ছে দেশ ও দেশের বাইরে থাকা কয়েকটি মানব পাচার ও জিম্মি চক্রের মাধ্যমে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত অনুসন্ধানী রিপোর্টে কক্সবাজার–টেকনাফে মানব পাচারকারী বিশাল চক্রের এমনই পৈশাচিক চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, কক্সবাজার–টেকনাফের গহিন জঙ্গলে মানব পাচারকারীরা গড়ে তুলেছে আস্তানা। মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বহু শিশু–নারী–পুরুষকে প্রথম সেই আস্তানায় রাখা হয়। একসময় ট্রলারে করে শুরু হয় সাগরে যাত্রা। এর পরই শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। এ রকম একটি ট্রলার গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের বাহারছড়া থেকে যাত্রা শুরু করে। এতে পাচারচক্রের ১৩ জনসহ মোট আরোহী ছিলেন ২৭৩ জন। শতাধিক বাংলাদেশি, বাকিরা কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গা। চার দিন পর মাঝসাগরে প্রতারকচক্রের সঙ্গে জিম্মিদের মারামারি–হট্টগোলের এক পর্যায়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। করুণ পরিণতি ঘটে ২৬৪ জনের। ৯ জন দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টা সাগরে ভেসে থাকার পর কপালগুণে বেঁচে যান। জানা গেছে, কাছ দিয়েই যাচ্ছিল চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া ইন্দোনেশিয়াগামী একটি জাহাজ, সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনের আন্তরিক তৎপরতায় বেঁচে যান এই ৯ জন।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ‘কঠোর আইন হচ্ছে মানব পাচার রোধে’। এতে বলা হয়েছে, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বাংলাদেশের জন্য বহু বছর ধরেই একটি বড় সংকট। দেশে গৃহকর্মী, ইটভাটা, চা–বাগান থেকে শুরু করে বিদেশগামী শ্রমিক নির্যাতন সব জায়গাতেই পাচার ও শোষণের ধরন বদলে গেছে। এই বাস্তবতায় সরকার মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ব্যাপক সংশোধন আনতে যাচ্ছে।

মানবপাচার নির্মূল করা সম্ভব না হলেও, একে সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য আমাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। মানবপাচার রোধে সর্বপ্রথম প্রয়োজন আত্মসচেতনতা। আত্মসচেতনতাই মানবপাচারকে রুখে দিতে পারে। বিদেশে গমনেচ্ছু কর্মীদের আত্মসচেতন হতে হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাপ্ত অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক। অজ্ঞতাকে ছুড়ে ফেলে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরপর সামাজিক সচেতনতা মানবপাচার বন্ধে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধকালীপ্রসন্ন ঘোষ : লেখক ও সাংবাদিক