সন্দ্বীপ, পটিয়া ও বাঁশখালী–এই তিন চৌকি আদালতসহ চট্টগ্রামের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি হলেও নতুন মামলা দায়েরের হার সমান বা তার চেয়ে বেশি থাকায় এই ম্যাজিস্ট্রেসিতে মামলার জট কিছুতেই কমছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমিয়ে আনতে হলে বিচারকসহ আদালতের সংখ্যা বাড়াতেই হবে। অন্যথায় দিনদিন মামলার সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। একসময় চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসিতে মামলার সংখ্যা কম ছিল জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত মেট্রো ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিচারাধীন মামলা ছিল ৫০ হাজার। কয়েক বছরের ব্যবধানে বর্তমানে সেই সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতের সংখ্যা বাড়ানো না গেলে চট্টগ্রামের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিরও একই পরিণতি হতে পারে।
ব্রিটিশ আমলে প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার বিচারপ্রার্থীদের দোরগোড়ায় সহজে আইনি সেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি এখতিয়ারসম্পন্ন ‘চৌকি আদালত’ চালু করা হয়েছিল। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮০ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় মোট ৭টি চৌকি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলো হলো–পটিয়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এবং ফটিকছড়ি চৌকি আদালত। বর্তমানে চট্টগ্রামের ৭টি চৌকি আদালতই সচল রয়েছে। তবে এদের মধ্যে সন্দ্বীপ, বাঁশখালী ও পটিয়া–এই তিনটি চৌকি আদালতে দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলার আমল গ্রহণ ও বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আর বাকি চৌকি আদালতগুলোতে শুধু দেওয়ানি মামলা পরিচালিত হয়ে আসছে।
দাপ্তরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সন্দ্বীপ চৌকি আদালতে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে ১,৫১০টি, বাঁশখালী চৌকিতে ৪,৬৯০টি এবং পটিয়া চৌকিতে ৩,৪৬১টি। চৌকি আদালতের ফৌজদারি কার্যক্রমের এই পরিধির বাইরে পুরো চট্টগ্রামের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির সামগ্রিক ক্ষেত্র আরও বিশাল। গত সেপ্টেম্বর মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আগস্ট মাস শেষে ম্যাজিস্ট্রেসিটিতে মোট বিচারাধীন মামলা ছিল ৪৪ হাজার ৮৮৩ টি। সেপ্টেম্বর মাসে নতুন করে দায়ের হয় ২ হাজার ৫১১ টি। অন্যভাবে প্রাপ্তি ১ হাজার ২৭৪ টি। সবমিলিয়ে বিচারাধীন মামলা হয় ৪৮ হাজার ৬৬৮ টি। এরমধ্যে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে নিষ্পত্তি ২ হাজার ৪৫৮ টি। সেই হিসেবে সেপ্টেম্বর মাস শেষে চট্টগ্রামের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ২১০ টি।
আদালত থেকে প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, চট্টগ্রামের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে বর্তমানে ২০১ টি মামলা উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিত রয়েছে। এছাড়া এ ম্যাজিস্ট্রেসিতে ৫ বছরের অধিক সময় বিচারাধীন রয়েছে এমন মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৫৩৫ টি। সেপ্টেম্বরের আগের মাস তথা আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান বলছে, মাসটিতে এ ম্যাজিস্ট্রেসিতে ২ হাজার ১৪৯ টি নতুন মামলা দায়ের হয়। অন্যভাবে প্রাপ্তি ঘটে ১ হাজার ৫২৯ টি। একই সময়ে ১ হাজার ৩৮৪ টি বদলিসহ মোট নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ৩৮৯ টি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সন্দ্বীপ, বাঁশখালী ও পটিয়া চৌকির ফৌজদারি তিন আদালতসহ পুরো চট্টগ্রাম জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে বর্তমানে কার্যকর আদালতের সংখ্যা মোটে ১৬টি। চট্টগ্রাম জেলার (মহানগর ছাড়া) ১৬ টি উপজেলায় থাকা ১৮টি থানার জন্য ১৬ টি আদালত কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। বিচারাধীন মামলার এই দীর্ঘসূত্রতা ও মামলাজট কমিয়ে আনতে এ ম্যাজিস্ট্রেসিতে আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন গতকাল দৈনিক আজাদীকে জানান, এই ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিচারক কিংবা অবকাঠামোগত কোনো বড় সংকট নেই। কোর্টহিলের একপাশে থাকা চট্টগ্রামের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনটি অত্যন্ত প্রশস্ত ও বড় একটি ভবন। এখানে মূলত আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিচারিক আদালতের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হলে মামলার জট অনেকাংশে কমে আসবে এবং বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন।












