ধ্রুপদি সাহিত্য এবং অ্যান কারসন

রতন কুমার তুরী | শুক্রবার , ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ

প্রাচীন, সুসংহত এবং কালোর্ত্তীণ সাহিত্য ধারাকে সাধারণ মানুষের কাছে অন্যভাবে উপস্থাপন করে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য কানাডয়িান লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক এবং গবেষক অ্যান কারসনের জুড়ি নেই। তিনি বছরের পর বছর ধরে এ–ধ্রুপদি সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে তিনি গ্রিক সাহিত্যকে এক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। আর তাই তিনি গ্রিক সাহিত্যের অন্দরমহলে প্রবেশ করে সেখান থেকে আহরণ করেছেন সাহিত্য নির্যাস। তারপর তিনি সেখান থেকে রচনা করেছেন একের পর এক সমকালীন সাহিত্য। তাঁর সে সাহিত্যগুলো সামপ্রতিক সময়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকেও যে আধুনিক সাহিত্যে রূপান্তর করে তা সাহিত্যপ্রেমীদের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলা যায় তা অ্যান কারসনই প্রথম দেখালেন। এটি অ্যান কারসনের বোধের নির্মহতা এবং মেধার ঔজ্জ্বল্যতা। যা সাহিত্যের ন্যায় নিষ্ঠার পারাকাষ্টে পরীক্ষিত। আমরা অ্যান কারসের লেখনির ভেতরে প্রবেশ করলে দেখতে পাই তিনি অসাধারণ লেখনি দক্ষতায় গ্রিক সাহিত্যকে আধুনিক সাহিত্যে রূপান্তর করেছেন। আর তাই তিনি নানা সাহিত্যধারার বিশেষ করে গ্রিক সাহিত্য বিভিন্ন শাখার মেলবন্ধনের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ তৈরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হিসেবে সামপ্রতিক কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কারসনের নাম ঘোষণা করে সুইডিশ একাডেমি। ভালোবাসা, কামনা ও হতাশা নিয়ে লেখা সাহিত্যকর্মগুলোতে তিনি প্রাচীন ঐতিহ্য ও রহস্যবাদের সঙ্গে আধুনিকতার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে অ্যান কারসনের নাম ঘোষণা করার পর সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিদ কার্লবার্গ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। কারসন এই মুহূর্তে আইসল্যান্ডে আছেন। সচিব বলেন, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর শুনে তিনি চমকে যান, তবে খুব খুশি হয়েছেন। সুইডিশ একাডেমির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে মেলবন্ধনের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ তৈরি করা তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের জন্য’ অ্যান কারসনকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে।

অ্যান কারসন একাধারে ধ্রুপদি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং প্রাচীন ভাষা, সাহিত্য, নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পণ্ডিত। ২০০১ সালে নিউইয়র্ক টাইমস তাঁকে ‘ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যরীতি চমৎকারভাবে মিলিয়ে লেখার ক্ষেত্রে এক অনন্য কারিগর’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

নব্বইয়ের দশকে অ্যান কারসনের ব্যতিক্রমী সমসাময়িক কবিতা তাঁকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার এনে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৬ সালের ল্যানান অ্যাওয়ার্ড এবং ১৯৯৭ সালের পুশকার্ট প্রাইজ। এর এক বছর পর প্রকাশিত হয় ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’। গ্রিক পৌরাণিক দানব গেরিয়ন ও হেরাক্লেসের গল্পকে আধুনিক যুগের ত্রিভুজ প্রেমের রূপ দেওয়া এই কাব্য–উপন্যাস ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

সুইডিশ একাডেমি জানায়, কারসনের প্রায় সব সাহিত্যকর্মের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘শব্দ নিয়ে ভাষাতত্ত্ববিদের ব্যাকুলতা আর নতুন অর্থ খোঁজার প্রতি কবির আকুলতার এক অপূর্ব মিলন।’ একাডেমি বিশেষভাবে তাঁর ‘নক্স’ কবিতাটির কথা উল্লেখ করেছে। ২০০০ সালে মারা যাওয়া ভাইয়ের স্মৃতিতে নিয়ে এই কবিতাকে তারা ‘এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, এই কবিতায় স্বজন হারানোর এক গভীর বেদনা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

অ্যান কারসন ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে থাকেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি আইসল্যান্ডের নাগরিকত্বও লাভ করেন। সুইডিশ একাডেমির নোবেল সাহিত্য কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডারস ওলসন কারসনের প্রশংসা করে বলেছেন, কারসন আত্মকেন্দ্রিক বর্ণনামূলক কবিতার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সমকালীন সাহিত্যে নতুন আঙ্গিকের সূচনা ঘটিয়েছেন।

অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য গ্লাস এসে’, ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’, ‘নক্স’, ‘ফ্লোট’ এবং ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাসব্যান্ড: আ ফিকশনাল এসে ইন ২৯ ট্যাংগোস’।

এর বাইরেও তিনি অসংখ্য প্রবন্ধ এবং সাহিত্যধর্মী বই লিখেছেন। বিশেষ পুরানো ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নিয়ে তিনি বিরামহীনভাবে গবেষণা করে চলেছেন। ইতিমধ্যে তিনি গবেষণাধর্মী ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নির্ভর সাহিত্য রচনায় বেশ সফলতাও পেয়েছেন। মানুষের স্নেহ, মায়া, মমতা, দুঃখ, বেদনাগুলোকে অ্যান কারসন ধ্রুপদি সাহিত্যের সাথে মিশিয়ে সাহিত্যে এক ভিন্ন ধারার সৃষ্টি করেছেন। যা বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। অ্যান কারসনের সৃষ্টি সাহিত্যপ্রেমীদের আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅ্যান কারসন-এর তিনটি কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধচবির হীরকজয়ন্তী উদ্‌যাপনে আয়োজক কমিটির প্রথম সভা