মংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির নির্দেশ

পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়ে গুরুত্বারোপ

| শুক্রবার , ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:০২ পূর্বাহ্ণ

মংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইসহ দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে খুলনা ও বাগেরহাট সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী সফরে তিনি উপকূলীয় এলাকার নদীভাঙন রোধ, সুপেয় পানির সংকট নিরসন এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়েও গুরুত্ব দেন।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে হেলিকপ্টারে সুন্দরবন পরিদর্শন শেষে বেলা সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন সরকার প্রধান। পরে নৌপথে বানৌজা মংলায় পৌঁছান তিনি। সেখানে ওয়ার্ডরুমে নৌবাহিনী, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল্লাহ হারুন, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিপ আহমেদ মোস্তফা, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, পুলিশ সুপার মো. জামিরুল ইসলাম এবং নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

সভা ও মধ্যাহ্নভোজ শেষে বিকেলে মংলা বন্দর জেটি পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। এসময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি। এরপর প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনে যান তিনি। পথে সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের সঙ্গে হাত মেলান।

দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি দেখা ও হাত মেলানোর সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা কালাম শেখ বলেন, গাড়ি থেকে নেমেই প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ভিড়ের মধ্যে আরও একবার হাত মেলানোর সুযোগ পেয়েছি। তার সঙ্গে হাত মেলানোর এমন সুযোগ জীবনে হয়তো আর আসবে না। আমি অনেক খুশি।

রবিউল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী এতটা সাদাসিধে জীবনযাপন করতে পারেন, তা তারেক রহমানকে না দেখলে বুঝতাম না। তিনি গাড়ি থেকে নেমে নিজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। আমরা খুব খুশি হয়েছি। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সার্থক হয়েছে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী বাগেরহাটের মংলা বন্দর সফর করেছেন। সফরটি স্থানীয় মানুষের কাছে রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রত্যাশারও প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের আশা, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ জোরদার হবে।

মংলার ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ বলেন, তারেক রহমানের আগমন তাদের অঞ্চলের উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। তার ভাষ্য, চীনের সঙ্গে মংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন নিয়ে করা চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে এবং এ অঞ্চলের ব্যবসা–বাণিজ্যে গতি ফিরবে।

ব্যবসায়ী হেমায়েত উদ্দিন বলেন, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রসারে উন্নত অবকাঠামো অপরিহার্য। তার প্রত্যাশা, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে মংলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে এ অঞ্চলে ব্যবসা–বাণিজ্য সমপ্রসারণের সুযোগ বাড়বে।

বিএনপি নেতা হাফিজুর রহমান তুহিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী মংলা বন্দর জেটি, সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট এলাকায় প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করেছেন। তার আশা, এ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে অসম্পূর্ণ জেটি নির্মাণ, ড্রেজিংসহ আটকে থাকা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তুহিনের মতে, প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় ব্যবসা–বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

মংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকর আলী বলেন, মংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ ত্বরান্বিত করবে বলে তারা আশা করছেন। তার মতে, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা–বাণিজ্য সমপ্রসারিত হবে এবং দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে প্রত্যাশা জানিয়েছেন। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক বলেন, মংলা বন্দরে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে তাদের সংগঠন বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তারেক রহমানের সফরের মাধ্যমে এ বৈষম্য নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা বাড়াতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা করেন তিনি।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার যেসব মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে : স্পিকার
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা