বিষমুক্ত চাষাবাদে ঘুরছে কৃষকের ভাগ্য

রাঙ্গুনিয়ায় আগাম শীতকালীন সবজির ফলন

জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া | বৃহস্পতিবার , ২২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় এবার আগাম শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং উপজেলা কৃষি অফিসের মাঠপর্যায়ের নিবিড় তদারকিতে বিষমুক্ত ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সাফল্য পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। উৎপাদিত এসব সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক বাজারে। উপজেলা কৃষি সমপ্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৩৬ হাজার কৃষক–কৃষাণি সবজি চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন, যার মধ্যে নারী কৃষাণির সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। তিন ফসলি উর্বর এসব জমিতে আগাম সবজির আবাদ করে হাজারো পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি নিশ্চিত হয়েছে বহু দিনমজুরের কর্মসংস্থান। সরজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন বিলের উঁচু জমি, পাহাড়বেষ্টিত এলাকা এবং কর্ণফুলী ও ইছামতী নদীসহ ইছাখালী খালের চরাঞ্চলে এখন চোখ জুড়ানো সবজির খেত। ইছামতী খালের পাড় ও রাজানগর ইউনিয়নের বিভিন্ন ব্লকে কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন শিম, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, বেগুন, টমেটো, মরিচ, পেঁয়াজ ও বাদামসহ নানা জাতের সবজি পরিচর্যায়। অন্যদিকে, বেতাগী ইউনিয়নে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ‘মালচিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে পলিথিনে খেত ঢেকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে টমেটো ও মরিচ চাষ করা হচ্ছে। প্রচুর সবজি উৎপাদনের কারণে চরাঞ্চলের একটি গ্রাম স্থানীয়ভাবে এখন ‘সবুজ সবজি গ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক এড়িয়ে জমিতে জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি পোকামাকড় দমনে ‘সেক্সফেরোমোন ফাঁদ’ ও পরিবেশবান্ধব নিরাপদ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে বাজারে এখানকার বিষমুক্ত সবজির আলাদা কদর তৈরি হয়েছে। নিজেদের এই অভূতপূর্ব সফলতা নিয়ে পদুয়া ইউনিয়নের তরুণ কৃষক ওবায়দুল্লাহ বলেন, কৃষি অফিসের পরামর্শ ও প্রণোদনায় আধুনিক প্রযুক্তিতে নিরাপদ সবজি চাষ করেছি। মৌসুমের শুরুতেই বাজারে ভালো দামে সবজি বিক্রি করতে পেরে অনেক লাভবান হচ্ছি। প্রবাস ফেরত উদ্যমী কৃষক আরিফ উদ্দিন জানান, প্রবাসী জীবন ছেড়ে দেশে এসে কৃষিতে আত্মনিয়োগ করেছি। মাঠে অন্যান্য কৃষকদের সাথে নিয়ে একই প্লটে ধান ও আগাম সবজি চাষে কাঙ্‌ক্িষত সাফল্য পেয়েছি। চরাঞ্চলের চল্লিশোর্ধ্ব কৃষক মো. রফিক বলেন, নিজের এক কানি জমিতে লাউ, বেগুন, মরিচ ও বাঁধাকপিসহ নানা জাতের সবজি ফলাইছি। জৈব সার ব্যবহারে ফলন যেমন ভালো হইছে, তেমনি বাজারে দামও ভালো পাচ্ছি।

তবে ফলন ও বাজারজাতকরণ সন্তোষজনক হলেও কিছু ক্ষেত্রে আশানুরূপ মূল্য না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন অনেক কৃষক। উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোদে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দাবি করেন তারা। উপজেলার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার প্রণব চন্দ্র মজুমদার জানান, সঠিক সময়ে মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও নিবিড় তদারকির কারণে এবার আগাম সবজির ফলন প্রত্যাশাতীত ভালো হয়েছে, যা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। সার্বিক বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন বলেন, পদুয়ার ওবায়দুল্লাহ ও প্রবাসী আরিফ উদ্দিনের মতো তরুণ উদ্যোক্তারা আগাম সবজি আবাদসহ আধুনিক চাষাবাদে পুরো উপজেলার কৃষিকে বদলে দিচ্ছেন। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে তাঁদের নিয়মিত প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও বীজ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যুবসমাজ চাকরির পেছনে না ঘুরে নিজস্ব আঙিনা বা জমিতে কৃষিকাজে যুক্ত হলে তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি দেশও কৃষিতে এগিয়ে যাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে বেকারত্ব দূরীকরণে সেলাই মেশিন
পরবর্তী নিবন্ধদেশ ও জাতির খেদমতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে