অনিয়ন্ত্রিত শহরমুখিতা ও অনানুষ্ঠানিক অরাজকতা : নগর বিপর্যয় রক্ষায় করণীয়

আশরাফ চৌধুরী | বৃহস্পতিবার , ২২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:০২ পূর্বাহ্ণ

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নগরায়ণ এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসন একটি অত্যন্ত বাস্তবমুখী স্বাভাবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। উচ্চশিক্ষা, বিশেষায়িত চিকিৎসা, বহুজাতিক করপোরেট কর্মসংস্থান, বড় মাপের ব্যবসা–বাণিজ্য কিংবা সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তার তাগিদে প্রান্তিক অঞ্চল থেকে মানুষ বিভাগীয় শহর বা রাজধানীতে আসবে এটি কেবল প্রত্যাশিতই নয়, বরং যেকোনো দেশের প্রগতির অন্যতম নির্দেশক। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও যোগ্যতানির্ভর এই সুশৃঙ্খল শহরমুখিতাকে নিরুৎসাহিত করা কখনো কোনো প্রগতিশীল সমাজের উদ্দেশ্য হতে পারে না।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্য জায়গায়। বর্তমানে আমাদের দেশে যে বিশৃঙ্খল, অনিয়ন্ত্রিত এবং লক্ষ্যহীন ভাসমান জনগোষ্ঠীর শহরমুখী স্রোত দেখা যাচ্ছে, তা কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক স্থানান্তরের সংজ্ঞায় পড়ে না। শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা বা নির্দিষ্ট চাকরির সুযোগ ছাড়া কেবল স্বল্প পরিশ্রমে অর্থ উপার্জনের অলিক আশায় গ্রাম থেকে নগরমুখী এই অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যার উল্লম্ফন আজ পুরো দেশের নগরজীবন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

১. গ্রাম ও শহরের বৈপরীত্য: কায়িক শ্রমের সংকট বনাম অনানুষ্ঠানিক অরাজকতা: বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে দিনমজুর ও কায়িক শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আধুনিক কৃষি, স্থানীয় নির্মাণ খাত কিংবা গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়নে দৈনিক ১২০০ টাকা মজুরি দিয়েও প্রয়োজনীয় শ্রমজীবী মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই একই সময়ে দেশের বড় শহরগুলোর ফুটপাত, অলিগলি এবং মূল সড়কগুলোতে দেখা যাচ্ছে কায়িক শ্রমবিমুখ এক বিশাল ভাসমান জনগোষ্ঠীকে।

গ্রামের কঠিন ও ঘামঝরা কাজ এড়িয়ে এই বিপুল সংখ্যক মানুষ শহরে এসে ভিড় করছে কিসের আশায়? অনুসন্ধানে উঠে আসে, এদের একটি বড় অংশ কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদনশীল আয়ে বিশ্বাসী নয়। তারা ঝুঁকছে শহরের অনানুষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রণহীন উপার্জনের দিকে। ফুটপাত দখল করে অবৈধ হকারি, সড়ক দখল করে শৃঙ্খলাহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো থেকে শুরু করে ফুটপাতে বসে মায়াকান্না, ভিক্ষাবৃত্তি, হিজড়া সেজে চাঁদাবাজি, প্রস্টিটিউশন, এমনকি ভাড়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক গুন্ডামির মতো অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে এই ভাসমান জনস্রোত।

এই অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের পেছনে কাজ করছে মূলত তিনটি অনুঘটক: নাগরিক চাকচিক্যের মোহ: গ্রামীণ জীবনের শ্রমসাধ্য জীবনযাত্রার বিপরীতে শহরের আধুনিকতার বাহ্যিক রূপ মানুষকে আকৃষ্ট করছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার অলিক জগত: ইন্টারনেটের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত শহরের কৃত্রিম সচ্ছলতার ছবি তরুণ সমাজকে দ্রুত ও সহজে অর্থ উপার্জনের প্রতি প্রলুব্ধ করছে। বলতে গেলে গ্রামীণ সমাজের স্বল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একাংশ ভাইরাল হওয়া নেশায় যা ইচ্ছে প্র্যাঙ্ক ভিডিয়ো বা অশ্লীল ভিডিয়ো বানিয়ে একটা টিকটক প্রজন্ম তৈরী করেছে। এগুলোর গ্রামভিত্তিক হলেও কর্মকাণ্ড কিন্তু শহর থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। মূল সমস্যা ওরা না, কিন্তু তাদের তৈরি করা কন্টেন্টগুলো গ্রামে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে। তারা ভাবছে– এ আর কী! তাহলে আমরাও ওদের মত করি না কেন? চলো শহরে চলে যাই।

রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা: গ্রামে রাজনৈতিক বা সামাজিক দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ শহরে ভাসমান আশ্রয় খুঁজছে, যা তাদের অনৈতিক উপার্জনে বাধ্য করছে।

২. নগরজীবনের স্থবিরতা ও সরকারি অবকাঠামোর অপচয়: অনিয়ন্ত্রিত শহরমুখিতার প্রথম ও প্রত্যক্ষ খেসারত দিতে হচ্ছে শহরের সাধারণ নাগরিকদের। একটি পরিকল্পিত নগরে পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য ফুটপাত তৈরি করা হয়। অথচ দেশের প্রধান শহরগুলোতে সেই ফুটপাত আজ সম্পূর্ণভাবে হকার ও অবৈধ দখলদারদের দখলে। যে শহরে সাধারণ নাগরিক নিরাপদে হেঁটে যেতে পারেন না, যে শহরের মূল সড়ক অননুমোদিত যানবাহনের জটে স্থবির হয়ে থাকে, সেই শহরকে আর আধুনিক নগর বলা চলে না। এর চেয়েও নির্মম বাস্তবতা দেখা যায় স্বাস্থ্য খাতে। একদিকে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। বারান্দায়, সিঁড়িতে বা নোংরা মেঝেতে শুয়ে হাজার শত রোগী যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। অন্যদিকে উপজেলা সদরগুলোতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০০ থেকে ১৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতালগুলোর অধিকাংশ কক্ষ তালামারা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে কেনা মূল্যবান চিকিৎসাসামগ্রী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি অব্যবহারে জং ধরে নষ্ট হচ্ছে। ডাক্তার ও চিকিৎসা কর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত না হওয়া এবং প্রশাসনিক তদারকির অভাবে গ্রাম ও উপজেলার মানুষ সামান্য চিকিৎসার জন্যও জেলা ও বিভাগীয় শহরে ছুটে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের বিশাল অবকাঠামো ধুঁকছে শূন্যতায়, আর শহরের ওপর তৈরি হচ্ছে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ।

৩. শিক্ষা, ব্যবসা ও চাকরির শহরমুখিতা নিরুৎসাহিত করা নয়: এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন, বৈধ ব্যবসা প্রসার, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বা নির্দিষ্ট পদমর্যাদার চাকুরি গ্রহণের জন্য মানুষের শহরমুখী হওয়াকে নিরুৎসাহিত করা এই আলোচনার লক্ষ্য নয়। একজন শিক্ষার্থী যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, একজন উদ্যোক্তা যখন ব্যবসা সমপ্রসারণে বিনিয়োগ করে, কিংবা একজন পেশাজীবী যখন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে শহরে আসে তারা নগরের অর্থনীতি ও সৃষ্টিশীলতায় ইতিবাচক অবদান রাখে।

সমস্যা সৃষ্টি করছে সেই অসংগঠিত ও ভাসমান অংশটি, যারা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা যোগ্যতা ছাড়াই শহরে এসে অরাজকতা সৃষ্টি করছে এবং শহরকে ধীরে ধীরে বস্তির স্তূপে পরিণত করছে। অনিয়ন্ত্রিত এই জনস্রোত রোধ করতে না পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের প্রধান শহরগুলো তার নাগরিক চরিত্র হারিয়ে পুরোপুরি একেকটি মেগা–বস্তিতে রূপান্তরিত হবে।

৪. সংকট উত্তরণে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা : এই অনিয়ন্ত্রিত শহরমুখী স্রোতের রাশ টেনে ধরে দেশব্যাপী সুষম উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অনতিবিলম্বে গ্রহণ করা আবশ্যক:

১. উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকর পুনরুজ্জীবন: উপজেলা ও স্থানীয় স্তরের শত শয্যার হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের অবস্থান বাধ্যতামূলক করতে হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও চিকিৎসার মান নিশ্চিত করলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রিক শহরমুখী চাপ অর্ধেকের বেশি কমে আসবে।

২. শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতের কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ: পথচারীদের স্বার্থে ফুটপাতকে যেকোনো মূল্যে হকারমুক্ত করতে হবে। অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাটারি রিকশা বন্ধ করা এবং ভিক্ষাবৃত্তি, চাঁদাবাজি ও সামাজিক অপরাধের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। শহরে বেআইনি উপায়ে অর্থ উপার্জনের সুযোগ বন্ধ হলে অলস অভিবাসন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কমে যাবে।

৩. গ্রামীণ কৃষিশ্রমের সামাজিক মূল্যায়ন ও আধুনিকায়ন: গ্রামীণ অর্থনীতিতে কায়িক শ্রমের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষিকাজ ও স্থানীয় উৎপাদনশীল কাজে যুবসমাজকে আকৃষ্ট করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও স্বল্প সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ: শিল্পকারখানা, প্রশাসনিক দপ্তর এবং মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু রাজধানী বা বিভাগীয় শহরে কেন্দ্রভূত না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সুষমভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।

শেষকথা: কোনো রাষ্ট্রই অনিয়ন্ত্রিত ও বিশৃঙ্খল নগরায়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারে না। যোগ্যতা ও যৌক্তিক প্রয়োজনে শহরে আসার পথ খোলা রেখে, ভাসমান উপায়ে অনৈতিক ও স্বল্প পরিশ্রমে অর্থ উপার্জনের আশায় শহর ধ্বংসের এই উন্মাদনা এখনই বন্ধ করতে হবে। নীতিনির্ধারকরা যদি এখনই সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ না করেন এবং প্রান্তিক অঞ্চলগুলোকে বাসযোগ্য ও কার্যকর করে না তোলেন, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশের শহরগুলো কেবল ধুলোবালি, যানজট আর বস্তির এক মহাসমুদ্রে পরিণত হবে যেদিন খুব বেশি দূরে নয়।

লেখক: শিক্ষক, চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধযত্নের ঘর
পরবর্তী নিবন্ধছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ : নবায়নযোগ্য জ্বালানির নতুন চাষ