কেন শিশুরা অপরাধে জড়াচ্ছে, কী করণীয়

চট্টগ্রামে শিশু মামলা আড়াই হাজার ছাড়াল

হাবীবুর রহমান | মঙ্গলবার , ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ

বাইরের ছেলেকে নিজেদের এলাকায় কেন নিয়ে আসা হলো–এই বলে সাগর নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। সাব্বির হোসেন নামের কিশোর গ্যাং লিডারের নেতৃত্বে নগরীর হামজারবাগ এলাকায় এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ২০২০ সালের ২৬ মে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় নাম আসে ১৭ বছরের কিশোর সালমানের (ছদ্মনাম)। যেহেতু তিনি শিশু সেহেতু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে আলাদা দোষীপত্র দাখিল করে। এরই ধারাবাহিকতায় সালমানের বিরুদ্ধে চার্জগঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। বর্তমানে মামলাটি চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–৭ এ সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে বিচারাধীন রয়েছে।

হামজারবাগের পাশের এলাকা আতুরার ডিপো। এলাকাটিতে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে এক কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার প্রধান আসামি শিশু ফয়সাল (ছদ্মনাম)। তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে দোষীপত্র দাখিল করলে আদালত তার বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরু করেন। এ মামলাটিও বর্তমানে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–৭ এ সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে বিচারাধীন রয়েছে।

শুধু এ দুটি মামলা নয়, চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে আইনের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে গেছে– চট্টগ্রামের ৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের গত আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান থেকে মিলেছে এ তথ্য। চট্টগ্রাম জেলায় আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত শিশু–কিশোরদের বিচার এসব ট্রাইব্যুনালেই হয়ে থাকে।

ট্রাইব্যুনালগুলোর সার্বিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেখানে মোট ৭ হাজার ৫৬৮টি মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে শিশু মামলার সংখ্যা দাড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪১ টিতে। একটি জেলায় এত সংখ্যক আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত শিশু মামলা বিচারাধীন থাকা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক গভীর সংকটের কথাই ফুটিয়ে তোলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছে– আইনের আশ্রয় বা আদালতের বিচার দিয়ে তো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরের আইনি প্রক্রিয়া সামলানো সম্ভব, কিন্তু কোমলমতি শিশুরা যাতে কখনোই অপরাধের পথে পা না বাড়ায়, সেই সামাজিক সুরক্ষাবলয় আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব?

আদালতের নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চট্টগ্রামের ৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মোট বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৭ হাজার ৫৮৬ টি, এরমধ্যে ২ হাজার ৬৪১ টি শিশু মামলা। ট্রাইব্যুনাল–১ এ ৭৫০ টি শিশু মামলাসহ মোট মামলা রয়েছে ২ হাজার ৮৫০টি, ট্রাইব্যুনাল–২ তে ২৮০ টি শিশু মামলাসহ মোট মামলা রয়েছে ৭৮৪ টি, ট্রাইব্যুনাল–৩ তে ২৫৩ টি শিশু মামলাসহ ৯১৫ টি, ট্রাইব্যুনাল–৪ এ ৪৭০ টি শিশু মামলাসহ ১ হাজার ১৯৪ টি, ট্রাইব্যুনাল–৫ এ ৩৫৬ টি শিশু মামলাসহ ১ হাজার ২৯ টি, ট্রাইব্যুনাল–৬ এ ৩৫১ টি শিশু মামলাসহ ৭৭১ টি ও ট্রাইব্যুনাল–৭ এ ১৮১ টি শিশু মামলাসহ মোট বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৫২৯ টি।

শিশুরা কেন অপরাধে জড়াচ্ছে ? সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশুরা হুট করে অপরাধী হয়ে ওঠে না, এর পেছনে কাজ করে বহুমুখী সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা বড় ভাইদের প্রভাবে কিশোররা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় সামান্য কথা কাটাকাটি বা গ্রুপিংয়ের সংঘাত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। এছাড়া কর্মব্যস্ততা কিংবা সচেতনতার অভাবে অনেক পরিবার সন্তানের মানসিক পরিবর্তন, বন্ধু মহল বা দৈনন্দিন চলাফেরা সময় মতো খেয়াল করতে পারছে না। ফলে তৈরি হওয়া একাকীত্ব তাদের অসৎ সঙ্গে টেনে নেয়। অনলাইন গেমের আসক্তি, পর্নোগ্রাফি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবও শিশুদের মধ্যে একধরনের আগ্রাসী ও নির্মম মনোভাব তৈরি করছে। সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ এবং হতাশার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। কমবয়সী হওয়ায় আইনি মারপ্যাঁচ এড়াতে পেশাদার অপরাধীরা শিশুদের মাদক বহন বা অপরাধের কাজে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির দৈনিক আজাদীকে বলেন, বিচারাধীন এসব মামলার একটি বড় অংশে রয়েছে মারামারি, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘাত, চুরি বা মাদক সংক্রান্ত অপরাধ। এর পেছনে কিশোর গ্যাং কালচার, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের দায় রয়েছে। এ অঞ্চলে শিশু মামলা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য সমাজব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর শৈথিল্য দায়ী।

অপরাধে যাতে শিশুরা না জড়ায়, তা নিশ্চিত করতে কী করা উচিত? আইবিদরা বলছেন, শিশুরা যাতে অপরাধের ধারে কাছেও না ভিড়ে, সে জন্য সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রকে ‘প্রিভেন্টিভ বা প্রতিরোধমূলক’ ব্যবস্থা নিতে হবে। বাবা–মাকে সন্তানের কেবল পড়াশোনা নয়, তার মানসিক অবস্থা ও প্রতিদিনের চলাচলের ওপর নজর রাখতে হবে। সন্তানের সাথে দূরত্ব কমিয়ে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে বিপথে যাওয়ার আগেই মা–বাবাকে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে। প্রতিটি পাড়া–মহল্লায় খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করতে হবে। খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যস্ত রাখলে তাদের অতিরিক্ত শক্তি ও মেধা গঠনমূলক কাজে ব্যয় হবে। স্কুল ও কলেজগুলোতে শুধু সিলেবাস ভিত্তিক পড়াশোনা নয়, বরং অপরাধের কুফল, রাগ নিয়ন্ত্রণ এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর নিয়মিত পাঠ বা সচেতনতামূলক আলোচনা বাড়াতে হবে। পাড়া–মহল্লায় উঠতি বয়সের কিশোরদের সন্দেহজনক আড্ডা এবং বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা যেকোনো সিন্ডিকেট বা গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার বা ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে শিশুদের দূরে রাখতে পরিবারের পক্ষ থেকে স্ক্রিন টাইম নির্দিষ্ট করে দিতে হবে এবং বাস্তব জীবনের সাথে তাদের সংযোগ বাড়াতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচারিক প্রক্রিয়া দিয়ে সমাজকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব নয়। তাই শিশুর হাতে অপরাধের অস্ত্র ওঠার আগেই তার হাতে বই, কলম আর খেলার সামগ্রী তুলে দেওয়ার দায়িত্ব সমাজ ও পরিবারকেই নিতে হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে উঠতে হবে ঘরের ভেতর এবং নিজের পাড়া–মহল্লায়। সর্বপরি, শিশু অপরাধ হ্রাসের ক্ষেত্রে সরকারের সৎ ইচ্ছা থাকতে হবে জানিয়ে সিনিয়র আইনজীবী আকতার কবির বলেন, শিশুদের রক্ষায় সুশাসন অবশ্যই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করল বিমান
পরবর্তী নিবন্ধ৬ ব্যাংকে চট্টগ্রাম বন্দরের ১২৬২ কোটি টাকা