সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি আছেন। নিহত দুই বাংলাদেশির মধ্যে একজনের বাড়ি বগুড়ায়, আরেকজনের কুমিল্লায়। আহত ৪ জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন। শনিবারের এ হামলা বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান সমর্থিত হুতিদের তৃতীয় হামলা ছিল। হুতিরা এ বছরের গ্রীষ্মে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যে হামলা শুরু করেছে, তারই অংশ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবার হামলায় আগুন ধরে গেছে। ইরান–সমর্থিত হুতিরা বিমান সংস্থা এবং যাত্রীদের সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করার কয়েকঘন্টা পরই এ হামলা হয়।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি, চারজন সৌদি নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। গত এক সপ্তাহের মধ্যে খালিদ বিমানবন্দর আরও দুইবার হামলার শিকার হয়েছে। তাতে চারজন নিহত ও আরও অনেকে আহত হয়েছেন। একটি উড়োজাহাজও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের নিহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে দেশটি অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। হামলায় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধর্মমন্ত্রী। বিস্ফোরণের ঘটনার পর ঢাকা থেকে আরও সাতটিটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। খবর বিডিনিউজ ও বাসসের।
অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারে করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত লোকজনে হাসপাতাল ভরে যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা সংকটজনক। কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই এ হামলার ঘটনা ঘটে। সৌদি আরবের হুমকি সতর্কীকরণ পদ্ধতি থেকেও কোনো পূর্ব সতর্কতা জানানো হয়নি। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে হওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা এটি। এ হামলায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকার হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদির যুদ্ধবিমান বহর হুতিদের বিরুদ্ধে আকাশ হামলা চালিয়ে তাদের সমর্থন যোগাচ্ছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দায় হুতিরা স্বীকার করেনি। কিন্তু সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করে এর জবাব দেওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের আক্রমণে ওয়াশিংটন যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, আমরা যোগ দিতে পারি। আমরা এটি খতিয়ে দেখব। আমরা সবেমাত্র এই হামলার ঘটনাটির বিষয়ে জেনেছি, তাই আমরা এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেব।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেসও এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বেসামরিকদের বিরুদ্ধে ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন আর অবশ্যই অবিলম্বে এগুলো বন্ধ করতে হবে। এদিকে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে তার জের এখন ইয়েমেন ও সৌদি আরবে ছড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকার তীব্র নিন্দা : বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের প্রাণঘাতী হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের নিহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে দেশটি অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ১০ অক্টোবরের এই হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে বহু মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশ নিহত বাংলাদেশিসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর শোক ও আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছে এবং আহত সকলের দ্রুত ও পূর্ণ সুস্থতা কামনা করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক নাগরিকদের জীবন বিপন্নকারী এবং বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো এ হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। বাংলাদেশ হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের সরকার ও ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি দৃঢ় সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশ অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে চলমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
একজন বগুড়ার, আরেকজন কুমিল্লার : হুতিদের হামলায় যে দুজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, তাদের একজনের বাড়ি বগুড়ায়, আরেকজনের কুমিল্লায়। সৌদি কর্তৃপক্ষ ও নিহতদের পাসপোর্ট মিলিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়ার কথা গতকাল জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। নিহত মো. শাহেদ আহম্মেদের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুর থতানার মাদলা গ্রামে। তার বাবার নাম মো. রফিকুল ইসলাম, মায়ের নাম মোছা. শাহেরা বেগম। মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি নামে নিহত আরেকজনের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামে। তিনি মোহাম্মদ উল্লাহ ও জাহানারা বেগমের সন্তান।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে মোট ১৪ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার কথা গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তবে এর মধ্যে নতুন দুজন অন্তর্ভুক্ত কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। নিহতদের মরদেহ ফেরত আনার বিষয়ে এক প্রশ্নে বলেছেন, এখন পর্যন্ত যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তাদের সবাইকে ফেরত এনেছে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এই দুজনের মরদেহ শিগগির দেশে আনার পদক্ষেপ নেবে সরকার। তিনি বলেন, সাধারণত প্রবাসী কর্মীদের মরদেহ দেশে ফেরত আনার সব ব্যয় সরকার বহন করে। এ ব্যাপারে কোনো ব্যত্যয় হবে না।
আহত ৪ বাংলাদেশি আইসিইউতে : হামলায় আহত তিন শতাধিক ব্যক্তির মধ্যে ৪ জন বাংলাদেশি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তবে ওই ঘটনায় মোট কতজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন তার তথ্য সংগ্রহে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রিয়াদে বাংলাদেশ মিশনের কাজ চলার কথা বলেছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা এই চারজন বাংলাদেশির পরিচয় জানার চেষ্টা করছি। কারণ তাদের পরিচয় জানতে সময় লাগছে। আমাদের মিশন সেখানে সৌদি সরকারের সাথে কাজ করছে, যেহেতু সেখানে একটা যুদ্ধাবস্থায় বলা যায়, সেক্ষেত্রে সেখানে অনেক জাতীয়তার মানুষই আছেন যারা আহত হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রাণ হারানোর এসব ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হিসাবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, আমরা আশা করব, এই পর্যায়ে এই যুদ্ধ বন্ধ হবে, এই হামলা বন্ধ হবে।
ধর্মমন্ত্রীর ক্ষোভ : হামলায় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। গতকাল ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ওমরাহ কাফেলার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ আলী কাশেমীর সঙ্গে কথা বলেছেন ধর্মমন্ত্রী। সে সময় তিনি আহতদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন এবং তাদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।












