দ্রুত এগুচ্ছে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্প ২০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ দিন

| সোমবার , ১২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:০০ পূর্বাহ্ণ

১৩ বছরের দীর্ঘসূত্রতা পেরিয়ে অবশেষে গতি পেয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল–২) নির্মাণ প্রকল্প। আগামী ২০ অক্টোবর এই প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ দিন নির্ধারিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সাথে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আইডিবির একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এসে সরেজমিনে পরিদর্শন করে গেছেন। সবকিছু মিলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম দ্রুত এগুচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অবলম্বন পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধনের ক্ষমতা সম্পন্ন এই রিফাইনারি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। দেশে ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ফলে বাড়তি মূল্যে পরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ এবং নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর বেশির ভাগই আমদানি করা হয় পরিশোধিত অবস্থায়। ক্রুড অয়েল থেকে রিফাইনড অয়েলের মূল্য চড়া। এতে দেশের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। ক্রুড অয়েল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা পেতো। বিপিসি বলেছে, ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে দেশে বছরে ৪৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হলে প্রতি বছর প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

বিপুল অর্থ সাশ্রয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১০ সালে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্টার্ন রিফাইনারি–২ নামে নতুন একটি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ২শ একর জায়গার এক পাশের ৭০ একর জায়গায় দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১০ সালে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হলেও পরে নতুন নতুন পরিকল্পনা, অনুমোদন, পুনঃপরিকল্পনা, ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থায়ন জটিলতা ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায় বছরের পর বছর আটকে ছিল প্রকল্পটি। প্রাথমিকভাবে ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনের মধ্য দিয়ে এর ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। প্রকল্পটির বর্তমান ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্পের অর্থায়নে ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মধ্যে ১ দশমিক ০০৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের পর সম্প্রতি আইডিবির একটি প্রতিনিধিদল ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শন করে গেছেন। আইডিবির অর্থায়নের পাশাপাশি প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারেরও বড় অঙ্কের অর্থায়ন থাকবে।

বর্তমানে প্রকল্পটির জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ২০ অক্টোবর পরামর্শক নিয়োগের জন্য অনুরোধপত্রের (আরএফপি) জবাবে প্রস্তাব দাখিলের নির্ধারিত তারিখ রয়েছে। প্রস্তাব দাখিলের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতা, কারিগরি সক্ষমতা ও আর্থিক প্রস্তাব যাচাই করে পরামর্শক নির্বাচন করা হবে।

এই নিয়োগ সম্পন্ন হলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে ওই প্রতিষ্ঠানটি বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করা, দরপত্রের নথি প্রস্তুত, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, প্রস্তাব মূল্যায়ন, নির্মাণ ঠিকাদার নির্বাচনে সুপারিশ এবং নির্মাণকাজ তদারকিসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। এর মাধ্যমে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।

ইআরএল–২ চালু হলে বছরে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে। তখন ইস্টার্ন রিফাইনারির মোট বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে। আইডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৩৯৪ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদার প্রায় ৪৫–৫০ শতাংশ দেশীয় পরিশোধন সক্ষমতার মাধ্যমে পূরণের সুযোগ তৈরি হবে। একইসাথে এতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পে ইউরো–৫ মানের জ্বালানি উৎপাদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন ইউনিটে পেট্রোল ও ডিজেলের পাশাপাশি জেট ফুয়েল, এলপিজি, বেইজ অয়েল, ফার্নেস অয়েল, বিটুমিনসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিমান চলাচল, পরিবহন, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো খাতে ব্যবহৃত জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ক্রুড অয়েল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বাড়তি সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণের সঙ্গে গভীর সমুদ্রে স্থাপিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ও ডাবল পাইপলাইন ব্যবস্থার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ অবকাঠামোর মাধ্যমে বড় জাহাজ থেকে অপরিশোধিত তেল দ্রুত স্থলভাগের সংরক্ষণাগারে নেওয়া সম্ভব। ফলে তেল খালাসে সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শরীফ হাসনাত আজাদীকে বলেন, ইআরএল–২ প্রকল্প নতুন গতিতে এগুচ্ছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ সম্পন্ন হলে এই কার্যক্রম আরো গতি পাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকুমিল্লায় কিশোরী তানজিম হত্যা কক্সবাজারে বন্ধু রাজু গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধরিয়াদ বিমানবন্দরে হুতি হামলা,দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২