শান্তির খোঁজে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ এখন আহাজারী করছে, আমরা সর্বত্রই শান্তির খোঁজ করছি, শান্তি শুধুই রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়–ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, ধর্ম সব জায়গায় আমরা শান্তির অন্বেষই করছি। কিন্তু কোথাও না কোথাও অশান্তির বিষবাষ্প রয়েই যাচ্ছে। ১৯৮১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য একটি দিবস প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয় যে, ২০০১ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ শে সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘ নিউইয়র্ক সিটিতে অবস্থিত সদর দপ্তরে শান্তিঘণ্টা বাজিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি–দিবস করা হবে এবং এ দিনটি হবে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ও সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বানের দিন। জাতিসংঘ ঘোষিত ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক বিশ্ব শান্তি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল “ওহাবংঃ রহ চবধপব – ঋড়ৎ ঊাবৎুড়হব, ঊাবৎুযিবৎব, ঊাবৎু উধু” (শান্তিতে বিনিয়োগ করুন–সবার জন্য, সবখানে, প্রতিদিন)। এই প্রতিপাদ্যটির মূল লক্ষ্য হলো সমাজের প্রতিটি স্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয়ভাবে শান্তি রক্ষাকারীদের সম্মান জানানো। একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দিবসটি পালন করে।
আজ বিশ্বে নানা কারণে যুদ্ধ আরও বেশি প্রাণঘাতী এবং সংঘাতময় হয়ে উঠছে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বিশ্ববাসী বিভিন্ন সংকটের মোকাবিলা করছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, ঘরবাড়ি হারাচ্ছে এবং বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ, রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ এবং সামাজিক বৈষম্য বিশ্বশান্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি ধর্মেই বলা হয়েছে শান্তির কথা অথচ বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় কারণেও বিনষ্ট হচ্ছে শান্তি। বিশ্বে কেবল যে আপাতদৃষ্টিতে অন্তহীন যুদ্ধ চলছে তাই নয়, বরং সংঘাত ও বিভাজনে বর্ণবাদ, ইসলামোফোবিয়া, ইহুদি–বিদ্বেষ এবং অন্যান্য ধরনের গোঁড়ামির শক্তিগুলো সমাজের প্রান্তিক পর্যায় থেকে বেরিয়ে এসে আজ বিভিন্ন সমপ্রদায়কে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। সংঘাত এবং যুদ্ধ অসংখ্য মানুষকে তাদের নিজ দেশ ত্যাগ করে, নিরাপত্তার জন্য দেশান্তরী হতে বাধ্য করছে।
অদ্ভুত হলেও সত্যি, অনেক পরাশক্তি বলছে তারা যুদ্ধ করছে শান্তির জন্য, কিন্তু কোন যু্দ্ধই কি শান্তির কারণ হতে পারে? বর্তমান পৃথিবীতে ডিপ স্টেটের স্বার্থ, ক্ষমতাসীন দেশগুলোর প্রভাব, ভূ–রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম, সম্পদ লুণ্ঠন, ধর্মের বিভেদ নিয়ে যুদ্ধে জড়াচ্ছেন–আবার তারাই অন্যদিকে বিশ্ব শান্তির কথা বলছেন। ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো যেন খেলছে পৃথিবীর মানুষের ভাগ্য নিয়ে। জর্জ বুশ বলেছিলেন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার জন্যই নাকি তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে শান্তির প্রয়োজনীয়তা আরও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। শান্তি শুধু মানবতার জন্য একটি মহৎ দর্শন নয়, শান্তি শুধু যুদ্ধ না থাকার নাম নয়, এটি একটি সকলের অধিকার। জাতিসমূহের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে, প্রথমে আমাদের নিজেদের জাতির অভ্যন্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর আমাদের জাতির অভ্যন্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে, আমাদের নিজেদের মধ্যে শান্তি প্রয়োজন। আমাদের পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে নানা যুদ্ধ–জটিলতার মীমাংসা করতে হবে। শত্রু পক্ষগুলো যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হলেই কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। সুইডিশ বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী এবং সমাজসেবী আলফ্রেড নোবেলের নামে প্রণয়ন করা ছয়টি পুরস্কারের মধ্যে এটি একটি। বিশেষ করে অন্য পাঁচটি ক্ষেত্রের তুলনায় শান্তি পুরস্কার বহুবার বিতর্কের মুখে পড়েছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাস অনেক গৌরবোজ্জ্বল হলেও কিছু বিজয়ীর নাম বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ১৯৭৩ ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও উত্তর ভিয়েতনামের নেতা লে ডাক থো যৌথভাবে শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন কিন্তু তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধ থামাতে পারেনি। ১৯৯৪ সালে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেসকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। তারা শান্তি চুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন, আশা করা হয়েছিল এটি ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধান করবে, কিন্তু সে যুদ্ধ আজও চলমান। ২০০৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শান্তি পুরস্কার পান, কিন্তু ওবামার দুই মেয়াদে মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় সঙ্গে যুদ্ধরত ছিল।মিয়ানমারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনের জন্য ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান দেশটির রাজনীতিবিদ অং সান সু চি। তবে ২০ বছর পর সু চি ক্ষমতায় এলে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তিনি ছিলেন নীরব। ২০১৯ সালে শান্তিতে নোবেল পান ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। কিন্তু এর এক বছরের মধ্যেই টাইগ্রে অঞ্চলে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি, যা পরবর্তী সময়ে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। সম্প্রতি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম সুপারিশ করেছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু বর্তমান সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বে একজন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচিত। তালিকা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাদ পড়ার জন্যেও বিখ্যাত নোবেল পুরস্কার। বিংশ শতাব্দীতে অহিংস আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা ভারতের মহাত্মা গান্ধী পাঁচবার মনোনয়ন পেলেও কখনও নোবেল পুরস্কার পাননি।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, কূটনৈতিক উদ্যোগ, মানবিক সহায়তা এবং সংঘাত নিরসনের মাধ্যমে জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেও, কিন্তু বর্তমান সময়ে জাতিসংঘের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। তবে শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, প্রতিটি দেশ, সরকার, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে শান্তির সংস্কৃৃতি গড়ে তুলতে হবে। সমাজের প্রতিটি সমস্যার জন্য আমরা সবাই সমানভাবে দায়ী নই, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পর্ক স্থাপন ও কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বোঝানোর যুক্তিসঙ্গত প্রচেষ্টার পরিবর্তে একে অপরের দিকে তীর ছুড়ে মারছি। আমরা নিজেরা আইনের কথা বলছি, কিন্তু আমাদের মনোভাব আইন আপনার জন্য, আমার জন্য নয়।
পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা থাকে অস্ত্রের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা, সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ এবং ঘৃণার পরিবর্তে মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হোক। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যেন নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়। পৃথিবীতে শান্তি আসুক, বিশ্বের সকল মানুষ শান্তির শ্বেত পারাবত খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু বাস্তব অর্থে শান্তি বয়ে আনতে আমরা কি সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছি? পূরণ হবে কি বিশ্বের জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।













