ঘুমের আগে প্রতিদিন রাতে সূরা মুলক তিলাওয়াতে মিলবে যেসব ফজিলত

ফখরুল ইসলাম নোমানী | শুক্রবার , ২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ

পবিত্র কোরআনের ৩০ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা, যা আল্লাহর কাছে ততক্ষণ সুপারিশ করবে, যতক্ষণ না তার পাঠকারীকে ক্ষমা করা হয়। সূরাটির নাম ‘সূরা মুলক’। সূরা মুলক কোরআনে কারিমের ঊনত্রিশ নম্বর পারার প্রথম সূরা। সূরার ক্রম অনুসারে এটি কোরআনের ৬৭ নম্বর সূরা। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সূরা এটি। আল্লাহতাআলার রাজত্ব–কর্তৃত্ব ও মহত্ত্বের বর্ণনার মাধ্যমে শুরু হয়েছে এ সূরা। আসমান ও গ্রহ–নক্ষত্রের সৃষ্টি–কুশলতা ও নিপুণতা উল্লেখের মাধ্যমে তাঁর কুদরতের কথা আলোচনা করা হয়েছে। কোরআন তিলাওয়াতের আমলকারীদের জন্য সূরাটি অনেক ফজিলতপূর্ণ। যা তার তিলাওয়াতকারীকে ক্ষমা করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত সুপারিশ করতে থাকে।

হজরত উসমান (রা.) যখন কবরের পাশ দিয়ে যেতেন, তখন কান্নায় তাঁর দাড়ি ও বুক ভেসে যেত। লোকেরা জিজ্ঞেস করত, আপনি জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা শুনেও এত বেশি কান্নাকাটি করেন না, কিন্তু কবরের পাশ দিয়ে গেলে এত কান্নাকাটি কেন করেন? তিনি বলেন, আমি হুজুর (সা.)-এর নিকট শুনেছি, কবর আখেরাতের প্রথম ঘাঁটি। যে ব্যক্তি এখানে নাজাত পেয়ে গেল, তার জন্য সমস্ত মনজিল আসান বা সহজ হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এখানে মুক্তি পাবে না, তার জন্য হাশর–নাশর আরও ভয়ানক হয়ে দাঁড়াবে।

তবে রাসুল (সা.) বলেন, প্রতিদিন এশার নামাজের পর রাতে ঘুমানোর আগে যে ব্যক্তি সূরা তাবারাকাল্লাজি অর্থাৎ সূরা মুলক তিলাওয়াত করবে, তার মৃত্যুর পর কবরের আজাব মাফ করে দেওয়া হবে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোরআন শরিফে ৩০ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা আছে, যা তার তিলাওয়াতকারীকে ক্ষমা না করা পর্যন্ত তার জন্য সুপারিশ করতেই থাকবে। সূরাটি হলো ‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক’ অর্থাৎ সূরা মুলক।

হাদিসে আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো রাতে সূরা মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না। অন্যদিকে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কবরস্থিত ব্যক্তির কাছে পায়ের দিক দিয়ে ফেরেশতারা শাস্তির জন্য আসতে চাইবে। তখন তার পদদ্বয় বলবে, আমার দিক দিয়ে আসার রাস্তা নেই। কেননা সে সূরা মুলক পাঠ করত। তখন তার সিনা অথবা পেটের দিক দিয়ে আসতে চাইবে। তখন সিনা অথবা পেট বলবে, আমার দিক দিয়ে আসার কোনো রাস্তা তোমাদের জন্য নেই। কেননা সে আমার মধ্যে সূরা মুলক ভালোভাবে ধারণ করে রেখেছিল। অতঃপর তার মাথার দিক দিয়ে আসার চেষ্টা করবে। মাথা বলবে, এদিক দিয়ে আসার রাস্তা নেই। কেননা সে আমার দ্বারা সূরা মুলক পাঠ করেছিল। সূরা মুলক হচ্ছে বাধাদানকারী। কবরের আজাব থেকে বাধা দেবে।

তাওরাতেও সূরা মুলক ছিল। যে ব্যক্তি তা রাতে পাঠ করে, সে অধিক ও পবিত্র–উৎকৃষ্ট আমল করল। নবীজি (সা.) কী ভাষায় কবরের আজাব থেকে পানাহ চাইতেন, তাও বর্ণিত হয়েছে হাদিস শরিফে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ায় বলতেন, হে আল্লাহ! আমি কবরের আজাব থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি জীবন–মৃত্যু ও দাজ্জালের ফিতনা থেকে।

কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে একটি আমলও আমাদেরকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করবে। তা হলো সূরা মুলকের আমল। এ সূরা তার আমলকারীর জন্য কবরের আজাবের সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।

প্রতি রাতে (রাতের যে কোনো সময়) সূরা মুলক তিলাওয়াত করা গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাত। হাদিস অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘আলিফ–লাম–মিম, তানজিলুল কিতাব’ (সূরা আস–সাজদা) ও ‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলকু’ (সূরা মুলক) তিলাওয়াত না করে কোনো দিন ঘুমাতেন না। তবে এর মানে এই নয় যে, সূরাটি দিনে পড়া যাবে না। এটি যে কোনো সময় পড়া যাবে; তবে রাতের বিশেষ জিকির হিসেবে এ সূরা পড়া উত্তম। সূরাটি নামাজের সঙ্গে পড়াও উত্তম। মুখস্থ না থাকলে দেখে দেখে অর্থ বুঝে পড়লে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়।

সূরা আল–মুলকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত রয়েছে। যে ব্যক্তি প্রতিরাতে সূরা মুলক পাঠ করবে, সূরা মুলক তার জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। তাকে কবরের আজাব থেকে হেফাজত করবে। এই ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাত–দিনের যেকোনো সময়ে সূরা মুলক তিলাওয়াত করা যায়। তবে হাদিসে বিশেষভাবে রাতে তিলাওয়াত করার কথা এসেছে।

অন্য হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা মুলক তিলাওয়াত করে, সে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট আমল করে এবং অসংখ্য নেকি লাভ করে। হাদিসের একাধিক বর্ণনায় এসেছে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তুমি নিজে সূরা মুলক পড় এবং পরিবারের সবাইকে ও প্রতিবেশীকে তা শিক্ষা দাও। কারণ তা মুক্তিদানকারী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার একান্ত কামনা যে, এই সূরাটি আমার প্রত্যেক উম্মতের অন্তরে গেঁথে থাকুক।

কোরআন তিলাওয়াতের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। পাক–পবিত্র থাকা অবস্থায় যে কোনো সময় কোরআন তিলাওয়াত করা যায়। তবে আল্লাহতায়ালা বিশেষ কিছু মুহূর্তের কথা উল্লেখ করেছেন, যে সময়গুলোতে আমল করা বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

রাসুল (সা.) বলেন, প্রতিদিন এশার নামাজের পর রাতে ঘুমানোর আগে যে ব্যক্তি সূরা তাবারাকাল্লাজি অর্থাৎ সূরা মুলক তিলাওয়াত করবে, তার মৃত্যুর পর কবরের আজাব মাফ করে দেওয়া হবে। মৃত্যুর পর কবরের প্রশ্নোত্তরের কথাও ভাবা দরকার। যদি প্রশ্নের উত্তর সঠিক দেওয়া হয়, তাহলে মহাসাফল্য; আর সঠিক উত্তর না দিতে পারলে জাহান্নামের কঠোর শাস্তিতে আক্রান্ত হতে হবে। যার এ বিষয়ে বিশ্বাস ও ভয় আছে, তার জন্য কবরের প্রশ্নোত্তরের সঠিক আমল করা সহজ। যার ভয় নেই, তার জন্য কঠিন।

মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিদিন এশার নামাজের পর রাতে ঘুমানোর আগে অসাধারণ এ সূরা তিলাওয়াত ও বোঝার তাওফিক দিন। সুতরাং যে ব্যক্তি এ সূরা তিলাওয়াত করবে, এর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করবে, আশা করা যায় সে এর সুপারিশ লাভ করবে এবং ক্ষমা ও জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅন্তরের সততা ও রূপান্তরই আসল পরিচয়
পরবর্তী নিবন্ধশান্তির খোঁজে পৃথিবী : প্রত্যাশা পূরণ হবে কি