রাতভর অভিনব প্রতিবাদ, দিনে ‘শ্বেত শাড়ির গণসাক্ষ্য’

চুয়েটে শাটডাউন চলছে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান প্রথম উপাচার্যের

রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি | মঙ্গলবার , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে চলমান সংকটের সুরাহা হয়নি। পদচ্যুত উপাচার্যকে পুনর্বহাল করার এক দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা টানা সাত দিন ধরে কমপ্লিট শাটডাউন চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনিক স্থবিরতার পাশাপাশি ক্লাসরুম ও পরীক্ষার হলগুলো এখন রূপ নিয়েছে শিক্ষার্থীদের রাত জাগার আড্ডাস্থলে।

গতকাল ছিল এই আন্দোলনের সপ্তম দিন। দিনভর নানা ব্যতিক্রমী কর্মসূচি ও শিক্ষক–কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল চুয়েট ক্যাম্পাস। রোববার সারা দিন আন্দোলন শেষে গভীর রাত পর্যন্ত নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশ ঠেকাতে মূল ফটকে পাহারা বসান শিক্ষার্থীরা। মধ্যরাতের নীরবতা ভেঙে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্ট ছিল তারুণ্যের নানা প্রতিবাদী আয়োজন। কেউ মেতে ছিলেন কার্ড খেলায়, কেউ গিটারে তুলেছেন সুর। কারো চোখ ছিল ল্যাপটপের পর্দায়। আবার কেউ অনলাইন ফুটবল গেমের (ই–ফুটবল ও ফিফা) ভার্চ্যুয়াল যুদ্ধে মেতে ছিলেন। ফাঁকা রাস্তায় ক্রিকেট খেলে সময় পার করতে দেখা গেছে অনেক শিক্ষার্থীকে।

গতকাল দিনের প্রথম কার্যদিবসে চুয়েটের আন্দোলন ভিন্নমাত্রা নেয়। এদিন সকালে শিক্ষার্থীরা পালন করেন ‘শ্বেত শাড়ির গণসাক্ষ্য’ কর্মসূচি। একটি সাদা শাড়িতে রং ও তুলির আঁচড়ে সাবেক উপাচার্যের ৫৬ দিনের কাজের খতিয়ান, প্রতিকৃতি এবং বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত ফুটিয়ে তোলেন তারা। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই শহিদ মিনারে শুরু হয় ব্যতিক্রমী আয়োজন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে উন্মুক্ত প্রজেক্টরে চলচ্চিত্র ‘বনলতা এঙপ্রেস’ উপভোগ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এভাবে গত সাত দিনে আন্দোলন রূপ নিয়েছে নানা সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী প্রতিবাদের মঞ্চে। কখনো ‘লাল কার্ড প্রদর্শন’, কখনো ‘মশাল মিছিল’, আবার কখনো ‘৫৬ কেন’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছে ক্যাম্পাস।

এদিকে গতকাল শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জন করেন চুয়েটের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে বক্তারা ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ মাসরুর আহম্মদ বলেন, আমাদের দাবি একটাই, সরকার যে প্রজ্ঞাপনটা জারি করেছে, সেই প্রজ্ঞাপনটা আমরা প্রত্যাহার চাচ্ছি। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয়তা ধরে রাখা। আমাদের এখানে শিক্ষকদের চাওয়া–পাওয়ার কিছুই নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা যথেষ্ট দুশ্চিন্তা ও মানসিক হতাশার মধ্যে আছি। আমাদের এই প্রকৌশলীরা পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের সমসাময়িক অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা পাস করে বেরিয়ে গিয়ে চাকরির বাজারে ঢুকে যাবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে। আমরা ক্লাস নেওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব। চেষ্টাও করছি। সরকারের প্রতি বিনীত আবেদন, এই অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মো. ইকরাম বলেন, চুয়েট একটা পরিবার। শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে আন্দোলন করছেন, শিক্ষকেরাও একই দাবিতে কর্মবিরতিতে আছেন। এই দাবি তো যৌক্তিক। আমরাও এই দাবির পক্ষে আছি। তাই আমরা কর্মবিরতির পাশাপাশি অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি।

২৬ সেপ্টেম্বরের একটি অনলাইন জরুরি সভার আংশিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ মুক্ত আলোচনার খণ্ডিত অংশ প্রকাশ করে তাদের আন্দোলন উসকে দেওয়ার তকমা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে শিক্ষক সমিতি। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণার নিন্দা জানিয়ে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, বিচ্ছিন্ন বক্তব্যকে শিক্ষক সমিতির সামগ্রিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা অসঙ্গত ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী। এর ফলে শিক্ষকেরা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি তথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ ও মতামত প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।

উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মত দিয়েছেন চুয়েটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই কোনো দৃশ্যমান সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে অপসারণ করে অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে উপাচার্য নিয়োগে আইনি কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও বহিরাগত কোনো শিক্ষকের পক্ষে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করতে বাড়তি সময় প্রয়োজন হয়। বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের উচিত বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা। একই সঙ্গে বিদায়ী উপাচার্যকে ঠিক কী কারণে অপসারণ করা হলো, সেই নেপথ্য কারণগুলোও স্পষ্ট করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

উল্লেখ্য, ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। কিন্তু৫৬ দিন কার্যভার পালনের পর গত সপ্তাহে তাকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এই আকস্মিক রদবদল মানতে নারাজ শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে অধ্যাপক সায়েমকে পুনরায় স্বপদে বহাল করার এক দফা দাবিতে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইঞ্জিনে ত্রুটি কাটিয়ে কক্ষপথে পৌঁছাল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট
পরবর্তী নিবন্ধ‘ছোট বিজ্ঞানীরা’ কি একদিন দূষণমুক্ত চট্টগ্রাম উপহার দেবে