নিজের বাড়ির পথটুকুও কি একদিন অচেনা হয়ে যায়? সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই বাড়িতে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিদিনের মতোই ৭২ বছর বয়সী রহমান সাহেব বিকেলে একটু হাঁটতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও তিনি আর বাড়ি ফিরলেন না। প্রথমে পরিবার ভাবল, হয়তো পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর ফোন করা হলো, কিন্তু মোবাইল বন্ধ। এরপর শুরু হলো খোঁজাখুঁজি। ছেলে, মেয়ে, আত্মীয়স্বজন সবাই আশপাশের রাস্তাঘাট, দোকান, মসজিদ ও পরিচিত জায়গাগুলোতে খুঁজতে লাগলেন।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর একটি পার্কের বেঞ্চে তাঁকে পাওয়া গেল। তিনি চুপচাপ বসে আছেন। পরিবারের সদস্যরা ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন।
“বাবা, এখানে বসে আছ কেন? বাড়ি যাওনি?”
রহমান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “বাড়ি তো যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাড়িটা কোন দিকে, সেটাই মনে করতে পারছিলাম না।”
কথাটি পরিবারের সবাইকে স্তব্ধ করে দিল। যে মানুষটি কয়েক দশক ধরে এই এলাকায় বসবাস করেছেন, সেই মানুষটির কাছে নিজের বাড়ির পথটুকুই সেদিন অচেনা হয়ে গিয়েছিল।
এমন ঘটনা শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি হতে পারে ডিমেনশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
ডিমেনশিয়া কী?
ডিমেনশিয়া কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এটি এমন একটি অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে স্মৃতি, চিন্তাশক্তি, ভাষা, বিচার–বিবেচনা ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায় এবং তা ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। আলঝেইমার্স রোগ ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ এবং মোট ডিমেনশিয়ার প্রায় ৬০–৭০ শতাংশের সঙ্গে এটি জড়িত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছেন। আক্রান্তদের ৬০ শতাংশের বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করেন।
ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স কি একই?
একেবারেই নয়। ডিমেনশিয়া একটি ক্লিনিক্যাল সিনড্রোম, আর আলঝেইমার্স রোগ ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ।আলঝেইমার্স ছাড়াও স্ট্রোক ও মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ থেকে ভাসকুলার ডিমেনশিয়া হতে পারে। এছাড়া Lewy bodz dementia, frontotemporal dementia এবং অন্যান্য স্নায়বিক রোগও (Parkinson’s Disease) ডিমেনশিয়ার কারণ হতে পারে। তাই স্মৃতিশক্তি কমে গেলে শুধু ‘বয়সের কারণে’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
সব ভুলে যাওয়া কি রোগ?
বয়স বাড়লে সামান্য ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কারও নাম মনে করতে একটু সময় লাগা, চাবি কোথায় রেখেছি তা ভুলে যাওয়া কিংবা কোনো কথা মনে করতে দেরি হওয়া মানেই আলঝেইমার্স নয়।কিন্তু ভুলে যাওয়া যখন ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
বিশেষ করে যদি কেউ–
* সাম্প্রতিক ঘটনা বা কথাবার্তা বারবার ভুলে যান, * একই প্রশ্ন বারবার করেন, * পরিচিত জায়গায় গিয়েও পথ হারিয়ে ফেলেন, * টাকা–পয়সা, ওষুধ বা দৈনন্দিন কাজ পরিচালনায় সমস্যায় পড়েন, * পরিচিত রান্না বা অন্য কোনো কাজ করতে না পারেন, * কথা বলার সময় সহজ শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়, * সময়, স্থান বা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্ত হন
* ব্যক্তিত্ব বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিরোধে কী করা যায়?
বয়স ডিমেনশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হলেও এটি বয়স বাড়ার অবধারিত পরিণতি নয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, শ্রবণশক্তির সমস্যা এবং স্ট্রোকসহ বেশ কিছু পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি ডিমেনশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যার যথাযথ চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ।
ডিমেনশিয়ার সম্পূর্ণ নিরাময় এখনো সম্ভব নয়। তবে দ্রুত রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা, নিরাপদ পরিবেশ এবং পরিবারের সহযোগিতা রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে।
রোগীকে নয়, রোগটিকে মোকাবিলা করুন :
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির এসব আচরণকে ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা বা ‘পাগলামি’ হিসেবে দেখা উচিত নয়।পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধরতে হবে। রোগীকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া, নিয়মিত রুটিন বজায় রাখা, শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষকে নয়, রোগটিকে দেখুন। তিনি ইচ্ছা করে একই কথা বারবার বলছেন না, ইচ্ছা করে পথ হারাচ্ছেন না। তাঁর মস্তিষ্কের রোগজনিত পরিবর্তনই তাঁকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে।
তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক, বয়স্ক মানুষের ভুলে যাওয়াকে অবহেলা নয়, প্রয়োজনে মূল্যায়ন করব। কারণ কোনো একদিন যদি একজন প্রিয় মানুষ নিজের বাড়ির পথ ভুলে যান, তখন তাঁকে শুধু পথ দেখানো নয়, কেন তিনি পথটি ভুলে গেলেন, সেটিও খুঁজে দেখা জরুরি।
লেখক : এম ডি (নিউরোলজি), সহযোগী অধ্যাপক, নিউরোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল











