খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি, পরিবহন থেকে ইউটিলিটি–মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা আসছে সব দিক থেকেই। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবার; ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতেও পড়ছে তারাই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকের সবশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আগস্টে কিছুটা কমে হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবুও ২০২৫ সালের আগস্টে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, সেই একই পণ্য ২০২৬ সালের আগস্টে কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৮ টাকা ২৬ পয়সা। পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে আগস্টে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে। মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধির হারও আগস্টে কমেছে। ফলে গড় হিসাবে মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার চাপ এখনো বেশি রয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মিলছে না সাধারণ মানুষের। নিত্যপণ্যের বাজারে লাগামহীন দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিৎসা, পরিবহন ও শিক্ষাব্যয়। সংসারের খরচ সামলাতে একের পর এক প্রয়োজনীয় ব্যয় ছাঁটাই করছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে মাছ–মাংস; কমছে ফলমূল কেনা। ফলে পুষ্টির চাহিদার চেয়ে পেট ভরার খরচ মেটানোই যেন হয়ে উঠেছে বড় চিন্তা। পাশাপাশি বিনোদনেও লাগাম টানতে হচ্ছে। পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোও অনেকের কাছে এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খরচ কমাতে ঈদকেন্দ্রিক হয়েছে জামা–জুতা কেনা। জরুরি নয়–এমন সব কেনাকাটা বন্ধ করেও মাস শেষে হিসাব মেলাতে পারছেন না অনেকে। বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে ধারদেনা।
বিশ্লেষকরা বলেন, সরকারি বিক্রয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রতিদিন ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন বাজারের দর সংগ্রহ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের খুচরা বাজারদর প্রকাশ করে। তাতে উঠে এসেছে কত বেশি বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে কাঁচাবাজার ও মুদিদোকানে বিক্রি হওয়া বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দামই বেড়েছে। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি পণ্যের মূল্য কিছুটা কমলেও অপরিবর্তিত রয়েছে অনেকগুলোর দাম। দেশি কিংবা আমদানিকৃত পণ্য–কোনোটিই তেমন স্বস্তি দিতে পারছে না। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ব্যয়ের সিংহভাগই চলে যায় খাবারের পেছনে; তবে এ চাপ শুধু খাদ্যপণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাকি চিত্র স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খাদ্য–বহির্ভূত মূল্যস্ফীতির তথ্যে।
অন্যদিকে, যেসব শিল্পকারখানা আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা আরও বড় আর্থিক বোঝার মুখে পড়ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধ নতুন করে আরেক দফা ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে তেল ও গ্যাসের প্রধান উৎস থেকে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে; সরকারকে বাধ্য হয়ে বেশি দামের বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জ্বালানির এই বর্ধিত ব্যয় সরাসরি প্রভাব ফেলছে ইউটিলিটি বিল, পরিবহন ভাড়া ও কারখানার উৎপাদন খরচে। এতে সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজেট হয়ে উঠছে আরও সংকুচিত। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এখন সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সংসার চালাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শুধু ভোগান্তিই বাড়ছে না, বাড়ছে সংসারের খরচও। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেককে জেনারেটর বা বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় কেউ কেউ সিলিন্ডার কিনছেন, আবার অনেকে রান্নার জন্য ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। ফলে মাসিক ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি খরচ। তাঁরা বলেন, আপাতত জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো গেলে লোডশেডিং কমানো সম্ভব। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট পুরোপুরি দূর করার সুযোগ সীমিত। কারণ দ্রুত অতিরিক্ত জ্বালানি এনে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সহজ নয়। একই সঙ্গে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। তবে জ্বালানি সরবরাহ বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানোর সুযোগ সরকারের রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ক্রমাগত ব্যয় সংকোচনের মধ্য দিয়ে শুধু জীবনযাত্রার মানই নয়, মানুষের সামাজিকতা ও মানসিক স্বস্তিও সংকুচিত হচ্ছে। বাজারের চাপে একদিকে যেমন পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় ভোগ কমছে, অন্যদিকে পরিবার–পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিত্বে দিন কাটছে মানুষের। এর থেকে পরিত্রাণ দরকার।








