ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার শিশু তানিয়ার শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে রেফার করা কথা ভাবছে চিকিৎসকেরা। খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, গত ১২ তারিখ তানিয়া নামের ১১ বছরের একটা মেয়েকে আমাদের জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর থেকে আমরা বাচ্চাটিকে পর্যবেক্ষণ করেছি। পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন রিপোর্টগুলো দেখেছি। সে অনুযায়ী বাচ্চার কন্ডিশন খুব একটা ভালো না। বাচ্চার রক্তে ইনফেকশন আছে, যেটা সব জায়গায়ই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সেপসিস একটা খুব খারাপ মারাত্মক রোগ, সে হিসেবে আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ রোগীকে ভালো চিকিৎসার জন্য ভালো জায়গায় প্রেরণ করার। বাচ্চাটির বাবা এবং বাচ্চাটির গার্ডিয়ান বাকি যারা আছেন, তাদেরকে আমরা জিনিসটা জানিয়েছি। সে অনুযায়ী আমরা পরবর্তী পদক্ষেপটি নিব। বাচ্চাটির বর্তমান যে অবস্থা, তার শারীরিক, মানসিক সব দিক থেকে সে ডিপ্রাইভড অনেক দিক দিয়ে। এটা কিন্তু একদিনের না। মাসের পর মাস নির্যাতন করে বাচ্চাটিকে এই করুণ অবস্থার দিকে নিয়ে গেছে । এ চিকিৎসাটা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ট্রিটমেন্টের সাথে সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলিংও দরকার। সব মিলিয়ে আশা করি চিকিৎসাগুলো যদি সব কিছু একসাথে মিলে যায়, তাহলে বাচ্চাটি আশা করি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারবে।
তবে নিজে মামলা না করলেও সরকারের কাছে বিচার চেয়েছেন তানিয়া বাবা বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, এই যে আমার মেয়েরে যেভাবে হুইলচেয়ারে বসাইছে। আমিও যাতে আল্লাহর কালাম সাক্ষী রেখে বলি, ওনারেও (শিশু নির্যাতনকারী মোর্শেদা আক্তার (সুবনা) যাতে আল্লাহ এইভাবে হুইলচেয়ারে বসায়। কারণ আমার কোনো ক্ষমতা নাই তারে মারধর করার। আমার কোনো টাকা–পয়সাও নাই, অর্থও নাই।
তিনি আরো জানান, সরকারের কাছে দাবি হল– আমার মেয়েটার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা যেন করে পাশাপাশি যেন ঐ মহিলা সুবনাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এখন মামলা করতে গেলে আদালতে থানায় দৌড়াতে হবে। আমার মেয়েকে দেখার মতো কেউ থাকবে না। মেয়েটাকে ওয়াশরুমে যাইতে লাগলে আমি নিজে কোলে করে নিতে হয় বাপ হিসেবে। আমার মেয়েটাকে আর দেখাশোনা করবে কে? আমার মেয়ের উপর যে নির্যাতন হয়েছে আমি তার বিচার চাই। তার প্রচন্ড শাস্তি দাবি করছি।
মঙ্গলবার বিকেলে হাসপাতালের বারান্দায় হুইল চেয়ারে বসে তানিয়া তার উপর নির্যাতনে ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, আমাকে খুন্তি দিয়ে পোড়ানো, তারপর ছুরি দিয়ে, ব্লেড দিয়ে। গরম পানি আমাকে মারছে। আমাকে অত্যাচার করছে। বারান্দায় ফেলে রাখতো, ওয়াশরুমে ফেলে রাখতো। আমাকে কথা বলতে দিতো না আমার বাবার সাথে। রাতের বেলা বারান্দায় ফেলে রাখতো, দিনের বেলায় ওয়াশরুমে ফেলে রাখতো। তখন আমি বাবার সাথে কথা বলতে পারতাম না। আমি এখন এটার বিচার চাই। এঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি–তদন্ত) মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ঘটনাস্থল ঢাকায় হওয়ায় এখানে মামলা গ্রহণ বা কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
দম্পতি আটক : এদিকে গৃহকর্মী শিশু তানিয়াকে নির্মমভাবে নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত দম্পতি মোর্শেদা আক্তার (৩৮) ও তার স্বামী সাইফুদ্দিন রাসেল (৪৮) কে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকার কলাবাগানের গ্রীণরোডের একটি বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন তারা। বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাফরুল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম। আটককৃত দম্পতির বিরুদ্ধে ভিকটিমের বাবা মো. বেলাল হোসেন বাদী হয়ে মামলা দায়েরর প্রস্তুতি চলছে বলে জানায় ওসি।
প্রসঙ্গত ঢাকার মিরপুরের একটি বাসায় গৃহকর্মী শিশু তানিয়াকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।












