সর্বজনীন মানসম্মত শিক্ষার জন্য যোগ্য শিক্ষক জরুরি

| মঙ্গলবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ

দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। এই শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে। একজন শিক্ষক একটি বিষয়ে দক্ষ হলেও শিক্ষকস্বল্পতার কারণে তাকে অন্য বিষয়ের ক্লাসও নিতে হচ্ছে। এতে ক্লাস চালু রাখা সম্ভব হলেও শিক্ষার্থীরা কতটা কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা পাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থাকছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২। এর মধ্যে যেসব বিদ্যালয় নতুন জাতীয়করণ হয়েছে সেগুলোর অধিকাংশে প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদই সৃজন হয়নি। এর জেরে বিদ্যালয় সংখ্যা ৭০২ হলেও প্রধান শিক্ষকের পদ আছে ৫৭২টি। এই ৫৭২ পদের ৩৭৯টি শূন্য, যা মোট পদের ৬৬ শতাংশ। একই চিত্র সহকারী প্রধান শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষক পদের ক্ষেত্রেও। বিদ্যালয়গুলোয় সাধারণত এক বা একাধিক সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ থাকে। বর্তমানে ৭০৩ সহকারী প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত ১৭৫ জন আর শূন্য পদের সংখ্যা ৫২৮, যা মোট পদের ৭৫ শতাংশ। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক ১৬ হাজার ১৪১ পদের বিপরীতে কর্মরত ১০ হাজার ৯৩ জন, শূন্য পদের সংখ্যা ৬ হাজার ৪৮, যা মোট পদের প্রায় ৩৭ শতাংশ। শিক্ষকরা বলছেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বা সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে যারা আছেন তারা বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে তারা শ্রেণীকক্ষে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পাঠদানে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক তৎপর, সেখানে শিক্ষার মান, পঠনপাঠন এবং শিক্ষার্থীদের মনন বিকাশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তাই অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা থাকা শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক বিদ্যালয়ে ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়েরও শিক্ষক নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্লাস নেয়া হচ্ছে।’ রাশেদা কে চৌধূরীর মতে, এসএসসিতে খারাপ ফলের বড় কারণ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব। পর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগ থাকায় ক্যাডেট কলেজগুলো ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছে।

উল্লেখ্য, চলতি বছর মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সের তথ্যে উঠে এসেছিল যে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ একাদশ শ্রেণীতে যা শিখছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীর দক্ষতার সমান।

শিক্ষাগবেষকরা বলেন, মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত যোগ্য শিক্ষক। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে এ ক্ষেত্রেই বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার ২০২৩ সালের ৭৭ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৭৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে নিম্ন মাধ্যমিকে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার ৬২ দশমিক ১০ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৬১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের জন্য নিম্ন মাধ্যমিকে যোগ্য শিক্ষকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৮০ শতাংশ। ফলে দুই ক্ষেত্রেই বাস্তব অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। প্রায় ৩৮ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষক ন্যূনতম যোগ্যতার মান পূরণ করেন না। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক বিষয়ে এ সংকট বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার মান উন্নত হয় না ভালো শিক্ষক না থাকলে; বইপত্র, শিক্ষা উপকরণ ইত্যাদি মানসম্পন্ন না হলে; শিক্ষাদান ও গ্রহণ আনন্দময় না হলে; শিক্ষায় হেরফের থাকলে; তিনচার ধারায় শিক্ষাব্যবস্থা বিভক্ত থেকে গেলে, প্রতিটি কলেজে গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ এসব না থাকলে এবং শ্রেণিকক্ষ উজ্জ্বল ও আরামদায়ক না হলে। শিক্ষার সংকট এক দিনে দূর হবে না, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজ যদি সংকল্পবদ্ধ হয় শিক্ষাকে সংকটমুক্ত করতে, তাহলে ওই পথে অনেক দূরই এগিয়ে যাওয়া যাবে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষক সংকটের সুরাহা করা জরুরি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ কলেজেই শিক্ষক সংখ্যা অপ্রতুল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারীকরণ করা হয়েছে, সেগুলোতে সংকট সবচেয়ে বেশি। এর ফলে এগুলোয় শিক্ষার মান যেমন নিশ্চিত হচ্ছে না, তেমনি নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হারও বাড়ছে।

সর্বজনীন মানসম্মত শিক্ষার জন্য যোগ্য শিক্ষক জরুরি। তার ফলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে। মানসম্মত শিক্ষা সকলের মৌলিক ও মানবিক অধিকার। তাছাড়া মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষক প্রাপ্তি সম্ভব। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো সম্বলিত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মানসম্মত শিক্ষক অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধরুডল্‌ফ ক্রিস্টফ ইউকেন : নোবেল বিজয়ী জার্মান দার্শনিক