গ্যাসের পর এবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যন্ত্র। উৎপাদনে ফেরার সব প্রস্তুতি নিলেও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে সার উৎপাদন শুরু করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। তবে অ্যামোনিয়া উৎপাদন শুরু হয়েছে। ইউরিয়া পেতে আরো কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে বলে সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গ্যাসের অভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গ্যাস পেয়েছে সিইউএফএল। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার পর কারখানাটির অ্যামোনিয়া প্ল্যান্ট চালু হয়েছে। তবে ইউরিয়া উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার কারণে ইউরিয়া প্ল্যান্টে দেখা দেওয়া যান্ত্রিক ত্রুটি সারানোর আগে সার উৎপাদন শুরু করা যাবে না। বর্তমানে ত্রুটি সারানোর জন্য কাজ চলছে।
কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সিইউএফএল প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর অ্যামোনিয়া উৎপাদন শুরু করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর প্ল্যান্ট চালু করতে গিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও পাইপলাইনে ত্রুটি ধরা পড়ে। এসব ত্রুটি পরীক্ষা ও মেরামতের কাজ চলায় ১২ সেপ্টেম্বর ইউরিয়া উৎপাদনে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি।
সিইউএফএলের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রাকৃতিক গ্যাস থেকেই অ্যামোনিয়া উৎপাদন করা হয়। এরপর অ্যামোনিয়া ও কার্বন ডাই–অঙাইডের রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় ইউরিয়া। ফলে গ্যাস সরবরাহ পেলেই সরাসরি ইউরিয়া উৎপাদনে যাওয়া যায় না। অ্যামোনিয়া প্ল্যান্ট চালু করার পাশাপাশি ইউরিয়া প্ল্যান্টের সব যন্ত্রপাতি সচল ও নিরাপদ অবস্থায় আনা জরুরি।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে শুধু উৎপাদন বন্ধ থাকে না, যন্ত্রপাতির ওপরও এর প্রভাব পড়ে। পাইপলাইনে মরিচা, বিভিন্ন স্থানে লিকেজ এবং যন্ত্রাংশে মেকানিক্যাল ত্রুটি দেখা দিতে পারে। বর্তমানে এসব ত্রুটি চিহ্নিত করে মেরামতের কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগির ইউরিয়া উৎপাদন শুরু করা যাবে। তখন প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বর্তমানে সিইউএফএলে দৈনিক ৪০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রয়োজন দেখা দিলে সরবরাহ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সিইউএফএলের দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৭০০ টন। পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো গেলে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৬১ হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। অ্যামোনিয়ার দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার টন। কিন্তু গ্যাসের অপ্রতুলতা এবং কারখানার বিভিন্ন মেকানিক্যাল সমস্যার কারণে বছরের বড় একটি সময় কারখানাটি বন্ধ ছিল।
দেশে ইউরিয়ার চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। স্থানীয় কারখানাগুলো নিয়মিত উৎপাদনে থাকলে আমদানির চাপ কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। বিশেষ করে বোরো ও আমন মৌসুম সামনে রেখে ইউরিয়ার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ইউরিয়া উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাশের বহুজাতিক সার কারখানা কাফকোতে পুরো বছর সার উৎপাদন চললেও সিইউএফএল মাসের পর মাস বন্ধ থাকে। কাফকোর উৎপাদিত সার সরকার আন্তর্জাতিক দরে বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয় করে।
কর্ণফুলী নদীর মোহনায় আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ প্রিল্ড ইউরিয়া উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কারখানাটি স্থাপন করা হয়। ১৯৮৫ সালের অক্টোবরে নির্মাণকাজ শুরু হয়। জাপানের টয়ো ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন ছিল কারখানাটির জেনারেল কন্ট্রাক্টর। ১৯৮৭ সালের ২৯ অক্টোবর পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় সিইউএল। প্রায় চার দশকের পুরনো এই কারখানার বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে প্রায়শ সমস্যা দেখা দেয়। ইতোপূর্বে রিঅ্যাক্টরসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি পাল্টানো হয়েছে।












