বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গত এক দশকে অন্তত ২০টি দেশি–বিদেশি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে ২০১৮ সালের একটি প্রকল্পের আওতায় প্ল্যান্ট নির্মাণে বিদ্যুৎ বিভাগ দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো প্রতিষ্ঠান সাড়া দেয়নি। ফলে সে উদ্যোগও থমকে যায়। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়ায় বাকি প্রস্তাবনার একটিও আলোর মুখ দেখেনি। এ অবস্থায় গত বুধবার নগরে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)। এর মধ্য দিয়ে নগরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা আশার আলো জেগেছে। অবশ্য যে প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি নগরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো ফিজিবিলিটি স্টাডি করেনি। এছাড়া চসিকের সাথেও কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর (এমওইউ) হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়েও কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৭ মার্চ চসিকে মেয়রের সাথে দেখা করে যুক্তরাজ্যের ‘ডিপি ক্লিন টেক ইউকে লিমিটেড ও ইমপ্যাক্ট এনার্জি গ্লোবাল লিমিটেড’–এর প্রতিনিধি দল যৌথ উদ্যোগে পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আলোচনা করে। তারা শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলে। সর্বশেষ চলতি বছর তাদের একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। মূলত প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি।
এ বিষয়ে চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, ডিপি ক্লিন টেক ইউকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গেছে। পিপিপি অথরিটির সাথে চুক্তি হওয়ার পর তারা একটা কনসোর্টিয়াম–এর মাধ্যমে করবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কি পরিমাণ বর্জ্য লাগবে জানতে চাইলে বলেন, ‘তারা বলেছে ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৬শ থেকে ২ হাজার টন বর্জ্য লাগবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৬ একর জায়গা লাগবে।
পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা শেষ, তবু আটকে আছে : জাপানের প্রতিষ্ঠান ‘জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’ ২০২২ সালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চসিকের কাছে ‘ইন্টিগ্রেটেড ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট’ প্রকল্পের আগ্রহ দেখায়। এর অংশ হিসেবে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সমীক্ষায় চালায় জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’ এবং ‘ইয়চিও ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’ এর প্রতিনিধি দল দ্বিতীয় ধাপের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করার কথা জানায়। সমীক্ষা শেষে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সমীক্ষা রির্পোটও উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, নগরে দৈনিক উৎপাদিত বর্জ্য থেকে মাত্র এক হাজার টন ব্যবহার করে ১৫ দশমিক ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। যার মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহযোগ্য বিদ্যুৎ হবে ১২ দশমিক ৬ মেগাওয়াট। জেএফই জানায়, ২৫ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে চসিকের সরাসরি কোনো মূলধনী বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে না; বরং বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
সমীক্ষায় প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনটি ব্যবসায়িক মডেল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে– সরকার টু সরকার (জি–টু–জি) সহযোগিতা মডেল, প্রাইভেট সেক্টর বেনিফিট মডেল এবং লিমিটেড সাপোর্ট মডেল। এর মধ্যে প্রথম দুটি মডেলে ১১ শতাংশের বেশি অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার অর্জন সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকার–টু–সরকার সহযোগিতা মডেলকে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই মডেলে উৎপাদিত বিদ্যুতের শতভাগ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিক্রি করা হবে। নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে প্রায় ২৪ সেন্ট। এতে প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ মুনাফা হার ১১ শতাংশের বেশি অর্জন সম্ভব হবে।
সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরের ল্যান্ডফিলে যাওয়া বর্জ্যের পরিমাণ ৭০ থেকে ৯০শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে। এতে নগরে বিদ্যমান ল্যান্ডফিলের আয়ু বাড়বে এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান আজাদীকে বলেন, জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’–এর প্রকল্পটি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা ঠিক তারা সমীক্ষা চালিয়েছে।
জানতে চাইলে সিটি মেয়র ডা. শাহাদত হোসেন আজাদীকে বলেন, আমাদের তো দুটো প্রস্তাব আছে। একটা জাপানের এবং অন্যটি ইউকে–এর প্রতিষ্ঠানের। আমরা চাচ্ছি, চট্টগ্রাম শহরকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে। এজন্য আধুনিক ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। আমরা বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে চাই। সেক্ষেত্রে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা আগ্রহী।
এক দশকে অন্তত ২০ প্রস্তাব : ২০২৩ সালে চীনের প্রতিষ্ঠান ‘সেভিয়া–চেক–অর্চাড জেভি’র ‘চর বাকলিয়া’য় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্লান্ট বসাতে চসিককে প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবে সম্মতি দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্লান্ট বসাতে চর বাকলিয়ায় ৩৫ একর খাস ভূমি বন্দোবস্তের জন্য চসিককে প্রশাসনিক অনুমোদনও দেয়। এরপর বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্লান্ট বসাতে চসিকের অনূকূলে প্রতীকী মূল্যে ভূমি বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়া গেলে তা ‘সেভিয়া–চেক–অর্চাড জেভি’র ব্যবহারে আপত্তি নেই বলে জানায় চসিক। তবে সেখানে বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনে আপত্তি জানায় পরিবেশবাদীরা। সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।
এর আগে ২০১৫ সালে চট্টগ্রামসহ দেশের পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে নগরে ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর চসিকের সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো)। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী তৃতীয় পক্ষ বাছাই করবে পিডিবি। এরপর তাদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পের পূর্ত কাজ শুরু হবে। বিওও (বিল্ড, ওন অ্যান্ড অপারেট) পদ্ধতিতে কেন্দ্রটি নির্মিত হবে। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ বিভাগ দুই দফা দরপত্র আহ্বান করলেও প্ল্যান্ট নির্মাণে কোনো প্রতিষ্ঠান সাড়া দেয়নি। ফলে উদ্যোগটি আটকে যায়।
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ‘ন্যানোটেক সলিউশন এন্ড কনসাল্টেন্সি লিমিটিড’, ‘ইম্প্যাক্ট এনার্জি’, ‘ফাইভ কো–ফার্ম–এমই–এইচআইটিজেড–স্টার্টেম কনর্সোটিয়াম’, ‘অকল্যান্ড গ্রীন এনার্জি লিমিটেড’, ‘সিটি ডেডেভলপমেন্ট এনভায়নমেন্ট কোম্পানি’, ‘সোলার্স পাওয়ার লিমিটেড’, ‘সিঙ এলিমেন্ট এনার্জি’, ‘রাফা এনভায়রনমেন্টাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড’ এবং ‘এসডিআইসি’ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রস্তাব দেয় চসিককে।
জানা গেছে, ২০২১ সালের ৩ মে চায়নিজ ইনভেস্টর এসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা তৎকালীন মেয়রের সঙ্গে দেখা করে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার প্রস্তাব দেয়। প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য দৈনিক ১২০০–১৩০০ টন বর্জ্য এবং প্রতি কেন্দ্রের জন্য ১২–১৩ একর জমি প্রয়োজন বলে চসিককে জানায় চায়নিজ ইনভেস্টর এসোসিয়েশন। একইসময়ে সৌদি–জার্মান টেকনোলজি লিমিটেড নামের বিদেশি প্রতিষ্ঠান আরেকটি প্রস্তাব দেয় চসিককে। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪০ একর ভূমির কথা জানায়। প্রতিষ্ঠানটি বর্জ্য সংগ্রহ, সংগ্রহের জন্য যাবতীয় যানবাহন ও লোকবল, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে নিয়ে যাওয়াসহ সব ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে আগ্রহী। আলোর মুখ দেখেনি তার একটিও।
এর আগে ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর ‘সোলার্স পাওয়ার লিমিটেড’র অঙ্গ সংগঠন ‘এনডিওরিং এনার্জি’ ও প্রস্তাব দেয়। তারা জানায়, সলিড রিকোভারড ফুয়েল (এসআরএফ) পদ্ধতিতে ৩০ একর জায়গায় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। এজন্য দরকার হবে আড়াই হাজার টন বর্জ্য। এসআরএফ পদ্ধতিতে কয়লা থেকে ফুয়েলের (তেল) মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩০ শতাংশ কার্বন, ৮৫ শতাংশ নাইট্রোজেন, ৯০ শতাংশ সালফার, ৫০ শতাংশ ক্লোরিন নিঃসরণ করে কয়লার চাইতে পানির মাধ্যমে ৪০ শতাংশ সমন্বয় সাধন করা যাবে প্রকল্পে।
চসিকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রস্তাব দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রতিবেদন জমা দেয়নি। ফলে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি হয়নি। এ ছাড়া ভূমির সংকট, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতাও প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা ছিল।












