সুব্রত বড়ুয়া। বাংলাদেশের সাহিত্যে এক দুর্দমনীয় নাম। তাঁর পরিচিতি একাধিক কারণে পরিব্যাপ্ত। সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর প্রয়াস ও কৃতিত্ব তাঁকে কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্বরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কথাসাহিত্য তাঁর সিদ্ধি অবিসংবাদিত, অনুবাদে তাঁর স্বীকৃতি বিরল প্রসাদগুণসম্পন্ন, বিজ্ঞান লেখক হিসেবে তাঁর অধিষ্ঠান তর্কাতীত। এছাড়া প্রবন্ধ ও জীবনীগ্রন্থ রচনায় তিনি পরিশ্রমী স্রষ্টা হিসেবে পেয়েছেন বিশেষ খ্যাতি। শিশুসাহিত্য রচনায় ও সম্পাদনায় রয়েছে তাঁর দক্ষতা। এতোকিছুর বাইরে তাঁর আরেকটি পরিচয় তাঁকে বিশিষ্ট করেছে, সেটা হলো তিনি একজন কবি। সাহিত্য জীবনের সূচনায় কবিতাই তাঁর আরাধ্য ছিলো। বোধে, অনুভবে, বিশ্বাসে ও পারঙ্গমতায় তিনি মনেপ্রাণে সৎ ও শুদ্ধ। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘হলুদ বিকেলের গান’। এটি প্রকাশিত হয়েছিলো ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫। এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী হাশেম খান। মূল্য রাখা হয়েছিল ১৮ টাকা। প্রকাশ করেছেন মুক্তধারার পক্ষে চিত্তরঞ্জন সাহা। উৎসর্গ করেছেন ষাটের চার অকাল–প্রয়াত কবিবন্ধুর স্মরণে– ‘আবুল কাশেম, শশাঙ্ক পাল, হুমায়ুন কবির ও আবুল হাসান।’
২.
‘হলুদ বিকেলের গান’–এ মোট ৪৬টি কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রথম কবিতা ‘ঋণ’। তিনি লিখলেন:
ঋণ করেছি মাটির কাছে
যেমন ঋণী সকল বৃক্ষ
মাটির বুকে বসত বেঁধে
যেমন ঋণী মেঘের কাছে
শান্ত শীতল জলকণারা।
ঋণের দায়েই জীবন–বাঁধা
সকাল সন্ধ্যা হাঁটাহাঁটি
ঋণ ছাড়া আর পুঁজি তো নেই
আমার আমি কেবল মাটি।
এখানে কবিকে পাই নরম স্নিগ্ধ নীরব মনের এক শিল্পীকে। প্রকাশিত হয়েছে এমন আবেগ, যে আবেগ প্রকাশের জন্য কবিতাটি হয়েছে কোমল ও বিনয়বশত।
সুব্রত বড়ুয়া বাংলাদেশের প্রকৃতিকে চমৎকারভাবে এঁকেছেন তাঁর কবিতায়। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় ‘অনেক কবির পক্ষে প্রকৃতি মানবজীবনের নানা অভিজ্ঞতার পটভূমিকা; অনেকের পক্ষে ইন্দ্রিয়ের বিলাস, আবার কারো কারো পক্ষে আমাদের মনের অবস্থার প্রতিরূপমাত্র। প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে অনুভব না করেন এমন কোনো কবি নেই; কিন্তু সমগ্র জীবনকে প্রকৃতির ভিতর দিয়েই গ্রহণ ও প্রকাশ করেন এমন কবির সংখ্যা অল্প। তাঁরাই বিশেষভাবে প্রকৃতির কবি’। সুব্রত বড়ুয়াকে আমরা সেভাবেই দেখি, যিনি প্রকৃতির ভেতর দিয়ে জীবনকে অনুধাবন করেছেন। প্রতিটি কবিতায় আমরা প্রত্যক্ষ করি কবির সৃষ্টিশক্তি ও নিজস্ব দৃষ্টি। যে দৃষ্টিতে অতি সাধারণ দৃশ্যও অপরূপ হয়ে ধরা দেয়। অবলীলায় তিনি বলতে পারেন–
যেখানে যাই সেখানে এই নাড়ির সাথে টান
পড়ছে শুধু বৃষ্টি স্নাত সোঁদা মাটির ঘ্রাণ
যেখানে যাই সেখানে এই বাংলাদেশের মুখ
যেখানে যাই সেখানে এই স্মৃতির মধ্যে সুখ।
অন্যত্র বলেছেন–
যাওয়ার কথা ছিল অনেক দূর–
গ্রামের সীমানা পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে
ছোট ছোট চালাঘরের হাট পেরিয়ে
মাটি যেখানে ধুসর পেলবতা ছেড়ে
হয়ে উঠেছে কঠিন আর লাল–
সেই সমতলহীন পাহাড়ী আস্তানায়।
কিংবা–
এবার বর্ষণ হলে প্লাবনে নিষিক্ত হবে মাটি
শূন্যে চিল ডানা মেললে রৌদ্রে তার ভস্ম হবে ডানা
আগামী দিনের শিশু খুঁজে নেবে সবুজাভ চর
বাইরে খুঁজবো বৃথা, বুকে আছে গভীর ঠিকানা।
সুব্রত বড়ুয়ার কবিতার সৌন্দর্য এতোটাই স্পর্শকাতর যে, পাঠক কবিতাগুলো পাঠ করা মাত্রই পৌঁছে যান এক স্বপ্নিল ও রহস্যময় জগতে। যেখানে ধরা দেয় শিল্পের প্রতিচ্ছবি। সুরের গতিময়তা, ভাষার বলিষ্ঠতা ও বক্তব্যের সহজিয়া রূপ তাঁর কবিতাকে প্রাণময় করে তুলেছে। জটিল ও দুর্গম ভাবনাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন অন্তরঙ্গ আবেগে, সহজ ভঙ্গিতে, যা সুখপাঠ্য।
সুব্রত বড়ুয়া শিল্পসচেতন কবি। ‘বক্তব্যনিষ্ঠ এ কবির উচ্চারণ আবর্তিত হয়েছে জগত ও জীবনকে নিয়ে নানা জিজ্ঞাসায়, মানুষের বেঁচে থাকা এবং স্বপ্ন–স্মৃতি ও প্রেমের নিভৃত আলোড়নের তরঙ্গে।’ চলমান জীবনের একেকটি প্রতিচ্ছবি তাঁর একেকটি কবিতা। তাঁর অন্তর্জগৎ বা মনোলোক এবং সামাজিক সত্তা প্রবলভাবে অঙ্কিত হয়েছে সমস্ত কবিতায়।
না, কবিতা নয়, ভালোবাসা নয়–
সুখের স্বপ্নের মতো নরম মাংসের গ্রীবা
বাঁকিয়ে দাঁড়ানো নয় জেল্লাদার নিপুণ ভঙ্গিতে।
শুধু এই বিনীত নিয়মে জেগে আছি এস্ত
ভীতু, ক্ষুব্ধ সঞ্চরণে পায়ের শব্দের নিচে
কেঁপে ওঠে সমস্ত ভুবন
অন্ধকার করে গ্রাস
গ্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসোরাসের মতো
গিলে খায় দিনের উত্তাপ, রাত্রি, সূর্যশিখা
নবীন বাতাস, বৃক্ষ, স্বপ্নরাজি, নিবিড় সুষমা।
এ ধরনের কবিতার পাশাপাশি আছে কবির ব্যক্তিক অনুভূতি, আশা ও হতাশা। তাঁর কবিতা যেমন ধ্বনিপ্রবণ, তেমনি চিত্রার্পিত। তিনি জীবনের জয়গান যেমন গেয়েছেন, তেমনি কখনো কখনো ইঙ্গিতে পরোক্ষভাবে প্রকাশ করেছেন ব্যর্থতাবোধ। কতিার বিষয় নির্বাচনে তিনি পরিচয় দিয়েছেন সৌন্দর্য–সচেতন কবি হিসেবে। তবে জীবনের সঙ্গে আছে তাঁর সংযোগ। তাঁর শুদ্ধতা ও শুভ্রতার নিগূঢ় তাৎপর্য তাঁর কবিতাকে উজ্জ্বল করেছে, রূপোময় করে তুলেছে। তাঁর কবিতার স্বতন্ত্র মহিমা ও গভীরতা তাঁর মূলধন। তাঁর শক্তির উৎস ও প্রয়াস অভিনব। তাই অবলীলায় প্রকাশ করতে পারেন আশার মায়াবী ভাষা :
ফুরিয়ে যাওয়া এতোই সহজ
তবু কিছুই ফুরোয় নাকো
কোথায় যেন অলক্ষিতে
নির্মিত হয় নতুন সাঁকো।
কী শব্দ প্রয়োগে, কী বক্তব্যে, কী বিন্যাসে, কী আঙ্গিকে, কী উপমায়, কী ছন্দে তিনি এক শক্তিমান কবি।
‘হলুদ বিকেলের গান’ একটি দীর্ঘ কবিতা। এটি একটি চলচ্চিত্র। শব্দের সিঁড়ি বেয়ে বক্তব্যে ভাষায় ছন্দের দোলায় দুলে কবিতাটি পৌঁছে যায় পাঠকের অন্তরে। সমকালীন জীবন যন্ত্রণার বিশ্বস্ত, রূপকার হিসেবে তিনি স্তবকে স্তবকে তুলে ধরেছেন জীবনচিত্র।
৩.
ব্যক্তিগত জীবনে সুব্রত বড়ুয়া অত্যন্ত ভদ্র, হদয়বান, সুন্দর, উদার ও সৎ মানুষ। তাঁর সংস্পর্শ পেয়েছি বলে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, কী অসাধারণ মানবিক গুণে অধিকারী তিনি। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও পাণ্ডিত্য তাঁকে মহান করেছে, তাঁর কৃতি ও কৃতিত্ব তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। তাঁর চলাফেরা, জীবনাচরণ, স্বপ্ন–আকাঙ্ক্ষা এবং কথাবার্তার অন্তরঙ্গ আলোকে আমাদের বুঝে নেয়া কষ্ট হয় না যে, তিনি সাহিত্যের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। নিজের জীবনের ঘাত–প্রতিঘাত মাড়িয়ে, মেরুদণ্ড সোজা রেখে চলা এক মহান মানুষ সুব্রত বড়ুয়া। একজন নির্লোভ, নিরহংকার ও অকৃত্রিম মানুষ। জ্ঞানে–পাণ্ডিত্যে–ব্যক্তিত্বে অনুকরণীয় সাহিত্য ব্যক্তিত্ব। তাঁকে শ্রদ্ধা।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ফেলো, বাংলা একাডেমি।











