বেশ কিছুদিন পর বৃষ্টি শেষে রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল। তার সাথে ইমরানের সারপ্রাইজ! শুনে আরও বেশি মনটা ফুরফুরে হলো। এই লোকটার সারপ্রাইজ পেতে হলে আমাকে বরাবরই ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। কালরাতে বলতেই পারতো, না! সকালে নাস্তার টেবিলে অবশেষে জানা গেলো ১৭ই জুলাই ২০২৬ চীন–জাপান ট্যুরে বুকিং দিয়ে এসেছেন। খুশি হলাম, তবে প্রকাশ না করে খুশিটা আটকে রাখলাম!এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো দেখা হয়নি। জাপানের নাগাসাকি, হিরোশিমা, চেরি ব্লুসম! আরও কত কি! আহা! কতদিন ভেবেছি যাবো! চায়না জাপান মিলে প্রায় বিশ দিনের ট্যুর খুলশী ক্লাব থেকে। শুনার পর থেকে রীতিমতো প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি।সপ্তাহ খানেক পরে এসে ইমরান জানালো ট্যুরে কিছু পরিবর্তন হয়েছে আপাতত জাপান ভ্রমণ বন্ধ শুধু চায়না ট্যুর হবে ১০দিনের। তাও ভালো। বিশদিন দৌড়ের উপর থাকা আমাদের বয়সী মানুষের জন্য একটু কঠিনই বটে। দিনক্ষণ ঠিক হলো। আমরা খুলশী ক্লাবের ৮ পরিবার যাচ্ছি। বি ফ্রেস ট্যুরিজম থেকে খসরু সাহেব সব আয়োজন করবেন। ১৭ই জুলাই ২০২৬ ঢাকা থেকে রাত নয়টায় চায়না সাউদার্ন। আমরা চট্টগ্রাম থেকে কানেক্টিং ফ্লাইটে ঢাকা এসে সবাই একসাথে হলাম লাউঞ্জে। সাড়ে আটটার দিকে যাবতীয় ফর্মালিটিজ সেরে রওনা হলাম। আমাদের ভ্রমণসঙ্গী হলেন খুলশী ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট সামছুল আলম ভাই, ভাবী পারভীন আকতার, সাবেক সেক্রেটারি চক্ষু বিশেষজ্ঞ ড.করিম, ভাবী শিলা করিম এবং তাদের দুই ছেলে মেয়ে, আহমেদুল হক ভাই, পাপড়ি ভাবী, আবসার ভাই, রুনা ভাবী, জানে আলম ভাই, নুর আকতার জাহান ভাবী, আমজাদ ভাই, ভাবী ও তাদের দুই ছেলে মেয়ে, নাসির ভাই, ভাবী এবং আমার হাসবেন্ড ও আমি। সাথে বি–ফ্রেসের খসরু ভাই, তার স্ত্রী কনা ও তাদের ছেলে আফনাদ। ফ্লাইট প্রায় চল্লিশ মিনিটের মতো ডিলে। অবশেষে প্লেন উড়াল দিলো বেইজিং এর উদ্দেশ্য। পুরো উড়োজাহাজ ভর্তি বাঙালি। অল্প কয়জন চায়নিজ। কিছুক্ষণের মধ্যে রাতের খাবার চলে আসলো। হালাল চিকেন বিরিয়ানি, চকলেট, কেক, আমস্বত্ব, ফ্রুটস, এর বাইরে ছিল চা–কফি, নানা রকম জুসের অফার। যে যার পছন্দ মতো নিয়ে নিলো। খাওয়া দাওয়া শেষে টানা ঘুম দিয়ে যখন চোখ খুললাম প্লেন তখন নীচের দিকে নামতে শুরু করেছে। এয়ার হোস্টেসের সুললিত কণ্ঠ ভেসে আসছে, সীট বেল্ট যেন পরে থাকে সবাই, সীট থেকে উঠে কেউ যেন ব্যাগ নামানোর চেষ্টা না করে রানওয়েতে একবারে না থামা পর্যন্ত। বেইজিংয়ের পুবের আকাশ রঙের আলো ছড়িয়ে যেন আমাদের অভিবাদন জানাচ্ছে। আমরা বেইজিং পৌঁছালাম। কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই ইমিগ্রেশন শেষ হলো। এয়ারপোর্টে প্লেকার্ড নিয়ে অপেক্ষায় ছিল ইংরেজি জানা চায়নিজ গাইড। অপেক্ষায় ছিল বড় ট্যুরিস্ট বাস। ক্লান্ত ছিলাম বটে তবে সবাই উৎফুল্ল ছিলেন। ভোরের আলো ফুটে উঠছে একটু একটু করে। সূর্যের নরম আলো এসে আমাদের ছুয়ে দিচ্ছিলো।এর মধ্যে গাইড এসে নিজের পরিচয় দিলো। জানালো তার নাম মে। ইংরেজি মে মাসের নামে তার নাম। সহজ ইংরেজিতে তাদের দেশ, তাদের সামাজিক অবস্থান, বেইজিংয়ের দর্শনীয় স্থান, শপিং মল ও নিয়মকানুন সম্পর্কে কিছু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করলো। সেই সাথে বারবার বলে দিচ্ছিলো তোমরা হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে ১১–৩০ মিনিটের মধ্যে লবিতে চলে আসবে। অবশ্যই প্রাকৃতিক কাজকর্ম সেরে আসবে। আমাদের চার থেকে পাঁচ ঘন্টার জার্নিতে কোন টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ নেই। যাওয়ার পথে কোন পাবলিক টয়লেট নেই, সুতরাং বি কেয়ারফুল! মে আমাদের খুব মজা করে কথাগুলো বলছিলো।
বেইজিং এ আমাদের হোটেল ছিল Sun world Dynasty Hotel (ফাইভ স্টার হোটেল)। আমরা ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ গিয়ে দেখলাম এলাহি কান্ড! প্রচুর পশ্চিমা পর্যটক।থরে থরে সাজানো নানা রকম ফল,ফলের জুস,নানা রকম স্ন্যাকস, স্যুপ, ফ্রাইড চিকেন, ফ্রাইড রাইস, নানা পদের নুডলস, সিদ্ধ সবজি, ডিম, পাউরুটি, মাখন, জেলি,চা,কফি, কর্নফ্লেকস, দুধ। সাথে আমাদের জন্য হারাম এমন কিছুও পাশাপাশি ছিল। যেহেতু নাম লেখা ছিল তাতে আমাদের কোন সমস্যা হয়নি। যাওয়ার আগে নানারকম কথা শুনেছিলাম চীনাদের খাওয়া দাওয়া নিয়ে। কেউ কেউ ভয় দেখিয়ে বলেছিল, চীনারা কি খায়না? সাপ, ব্যাঙ, মুরগী, গরু, বেড়া,ইঁদুর সবই খায়! তা ওরা খেতেই পারে! আমরা সাবধানে একটু বেছে বেছে খেলাম।থরে থরে সাজানো নানা পদের সবুজ সতেজ সবজি ও ফলমূলের আধিক্য দেখে মনে হচ্ছে ওরা শাক সবজিই বেশি খায়। ভুঁড়িওয়ালা চীনা চোখে পড়েনি! কর্মঠ ও পেটানো শরীর।ওদের খাওয়াটাও দেখার মতো কাটি দুটো ধরে টুকটুক করে খেয়ে ফেলে! আমরা খাওয়া শেষ করে লবিতে এসে একত্রিত হলাম। আজকে আমাদের হাফ ডে সিটি ট্যুরে থাকছে Tienanmen Square ও Forbidden City. Forbidden City অর্থাৎ নিষিদ্ধ শহর। এই শহরে ৫০০শত বছর ধরে চীনের ২৪ জন সম্রাট ও তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রস্থল ছিল এই নগরী। চীনা সিং ও কিং সাম্রাজ্যের সময় অনুমতি ছাড়া সাধারণ জনগণের প্রবেশ নিষেধ ছিল এমন কি রাজপরিবারের আত্মীয় স্বজনেরা ও এখানে আসতে পারতো না। মূলত সম্রাট ও তাদের পত্নী ও উপপত্নীদের বাইরের জগৎ থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এই শহরে সবার প্রবেশ অধিকার নিষিদ্ধ ছিল। এই স্থাপত্যশৈলীগুলো বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও অনন্য নিদর্শন। এই রাজবাড়ীগুলো এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে চিত্র শিল্প, সিরামিক ভাস্কর্য, ব্রোঞ্জ ও এনামেলের উপর খোদাই করা বিভিন্ন শিল্পকর্ম। (চলবে)
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।












