জুম’আর খুতবা

কুরআন ও হাদীসের আলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অতুলনীয় মর্যাদা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ

আল্লাহর ভাষায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা: আল্লাহ তা’আলা তাঁর পেয়ার হাবীব, দোজাহানের সর্দার আমাদের প্রাণের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মর্যাদা ও তাঁর প্রতি উম্মতের আদব সম্মান প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে সূরা হুজরাতের শুরুতেই ঈমানদারদের শিক্ষা দিয়েছেন। উম্মত যেন নবীজির তাজিম ও সম্মানের ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে কোনো বিষয়ে অগ্রসর হয়োনা আর আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।” (সূরা: আল হুজরাত: )

বর্ণিত আয়াতের তাফসিরে ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন, এর অর্থ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে কোনো দ্বীনি বিষয়ে নিজের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবেনা। এ প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, “কিতাব ও সুন্নাহর বিপরীত কথা বলোনা।” প্রখ্যাত তাফসীরকার ইমাম আলুসী (রহ.) প্রণীত “রূহুল মা’আনীতে” এ প্রসঙ্গে প্রদত্ত ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ তাৎপর্যবহ, তিনি বলেন, “তাঁর সামনে অগ্রসর হওয়া” দ্বারা কিতাব ও সুন্নাহর অনুসরণ ছাড়া কোনো দ্বীনি বিষয়ে নিজের মতকে চূড়ান্ত মনে করা। যা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। হাকীমূল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী প্রণীত “তাফসীর নূরুল ইরফান” এ উক্ত আয়াতের শানে নুযুল প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে, কিছু সংখ্যক সাহাবী ঈদুল আযহার দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগে কুরবানি করে ফেলেছেন। অর্থাৎ ঈদুল আযহার নামাযের পূর্বে কুরবানি দিয়েছেন। কিছু সংখ্যক সাহাবী রমজানের একদিন আগেই রোজা শুরু করে দিতেন। তাঁদের প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে রাসূলের সিদ্ধান্তের আগে নিজের সিদ্ধান্তকে অগ্রধিকার দেয়া যাবেনা। (তাফসীর নুরুল ইরফান, সূরা: হুজরাত, প্রথম আয়াত সংশ্লিষ্ট শানে নুযুল, পৃ: ১৩৮৫)

নবীজির দরবারে নিচুস্বরে কথা বলার কারণে তাকওয়া ও ক্ষমার স্বীকৃতি: আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবীবের দরবারে রিসালাতের সম্মান ও আদব শিক্ষা দানের জন্য পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কন্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তাঁর সঙ্গে এমন উচ্চস্বরে কথা বলোনা। যেমন তোমরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলো এমন না হয় যে তোমাদের আমল সমূহ বিনষ্ট হয়ে যায় অথচ তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারোনা। (সূরা: আল হুজরাত, আয়াত: ), এর পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের কন্ঠস্বর নিচু করে আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করেছেন তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। (সূরা: আল হুজরাত, আয়াত: )- বর্ণিত ২নং আয়াতের শানে নুুযুল প্রসঙ্গে হাকীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রাহ.) প্রণীত “তাফসীর এ নুরুল ইরফান” এ বর্ণিত হয়েছে, এ আয়াত হযরত সাবিত ইবনে ক্বায়স ইবনে শাম্মাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে তিনি কিছুটা উচ্চস্বরে কথা বলতেন এবং শুনতেন। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি আর ঘর থেকে বের হচ্ছিলেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অনুপস্থিতির কারণ সম্পর্কে হযরত সা’দকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি সাবিত ইবনে ক্বায়েস কে জিজ্ঞেস করলেন তিনি বললেন আমি রাসূলুল্লাহর দরবারে উচ্চ আওয়াজ করার কারণে দোজখী হয়ে গেছি। তিনি বুঝতে পারলেন, অনুতপ্ত হলেন, নবীজি তাঁর এ কথা শুনে এরশাদ করেন “তাকে বলে দাও সে জান্নাতী”।

আয়াত সংশ্লিষ্ট হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) এর ঘটনা: সহীহ বুখারী শরীফে হযরত ইবনে আবি মুলাইকা থেকে বর্ণিত হয়েছে, একবার বনী তামীমের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলো হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) একজন কে দায়িত্ব দেওয়ার মত দিলেন, আর হযরত ফারুকে আজম ওমর (রা.) অন্য একজনের নাম প্রস্তাব করলেন, কথাবার্তার এক পর্যায়ে দু’জনের কন্ঠস্বর উঁচু হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা’আলা উক্ত আয়াত নাযিল করেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৮৪৫)

আয়াত আবতীর্ণ হওয়ার পর হযরতদ্বয় অতিমাত্রায় নিম্নস্বরে আলাপ করতেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির স্বকৃতিপ্রাপ্ত নবীজির সান্নিধ্যপ্রাপ্ত সত্যের মাপকাঠি, আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রতুল্য সাহাবায়ে কেরাম যাঁদের অপরিসীম ও অতুলনীয় মর্যাদার আলোচনা কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণিত ও ইসলামে স্বীকৃত তাঁরাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে তাজিম ও আদব প্রদর্শনের লক্ষ্যে নবীজির সামনে নিজেদের কন্ঠস্বরের ব্যাপারে কতটা সতর্ক ছিলেন তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নবীজির প্রতি আদব ও তাজিম প্রদর্শন করা আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব।

হাদীসের আলোকে বর্ণনা: হযরত তারিক রাদি. হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যখন সূরা হুজরাতের ৩নং আয়াত নাযিল হয় তখন আমি শপথ করলাম যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে কানে কানে নিম্নস্বরে কথা বলব। (ইমাম হাকিম: আল মুসতাদারাক, হাদীস: ৪৪৪৯)

রাসূলুল্লাহ কে আহবান ও সম্বোধনে সতর্কতা: মানুষ একে অপরকে পরস্পর যে ভাবে আহবান ও সম্বোধন করে যেমন ভাই, চাচা, পিতা ও মানুষ হিসেবে সম্বোধন করা তা থেকে নিষেধ করা হয়েছে, পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, তোমরা রাসূলকে তোমাদের পরস্পরের মতো করে ডেকোনা। (সূরা: আন নূর, ২৪:৬৩)-আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে কাসীর সুস্পষ্ট বর্ণনা করেছেন, তোমরা তাঁকে আহবান করতে গিয়ে সম্মান করে বলো “ইয়া নবিয়াল্লাহ”, “ইয়া রাসূলাল্লাহ”। (তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা নূর, আয়াত: ৬৩ সংশ্লিষ্ট তাফসীর)- রাসূলুল্লাহর জন্য সম্মান সূচক উপাধি, তাঁর প্রতি যথার্থ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহর নির্দেশ। এরশাদ হয়েছে যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো এবং তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা দাও। (সূরা: আল ফাতাহ, ৪৮:)- সুতরাং বর্ণিত আয়াত সমূহের আলোকে প্রামাণ্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহের বর্ণনা মতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের দৃষ্টিতে আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদব ও তাজিমের সঙ্গে “ইয়া রাসূলাল্লাহ”, “ইয়া নবিয়াল্লাহ”, “ইয়া হাবীবাল্লাহ” সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলা জায়েজ বৈধ ও শরীয়ত সম্মত।

নবীজির স্মরণকে আল্লাহ সমুন্নত করেছেন: আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবীবের স্মরণকে স্বয়ং নিজে সমুন্নত করেছেন, এরশাদ করেছেন, এবং আমি আপনার জন্য আপনার স্মরণকে সমুন্নত করেছি। (সূরা: ইনশারাহ, ৯৪:)

বর্ণিত আয়াতে করীমা বিশ্বব্যাপী আল্লাহর প্রিয় হাবীবের নাম স্মরণ মর্যাদা সম্মান উচ্চতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কুরআনিক দলীল। বিভিন্নভাবে আল্লাহ তা’আলা তাঁর মহান রাসূলের স্মরণকে সমুন্নত করেছেন। আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইসমাঈল হক্কী তাফসীর “রুহুল বয়ান” এ উল্লেখ করেন, আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহর স্মরণকে নবুওয়াত ও তাঁর বিধানসহ সমুন্নত করেছেন, তিনি বলেন, শাহাদাত আযান ও ইকামতের মধ্যে তাঁর নাম আল্লাহর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। (তাফসীর রূহুল বয়ান, সূরা: ইনশিরাহ ৪নং আয়াত সংশ্লিষ্ট তাফসীর)

আল্লাহ নিজেই রাসূলুল্লাহর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, নবীজির নাম আল্লাহর নামের সাথে ইবাদতের বহুস্থানে যুক্ত করেছেন। তাঁর রিসালাতের সাক্ষ্য ঈমানের জন্য অপরিহার্য করা হয়েছে। তাঁর প্রতি দরুদ সালাম প্রেরণ করার জন্য আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশ করা হয়েছে। তাঁর সম্মান ও আদব রক্ষা করা মুমিনদের জন্য ফরজ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব ও সম্মানিত নবীগন তাঁর শুভাগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত করেছেন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পছন্দ ছিলো সাদাসিধে জীবনযাপন
পরবর্তী নিবন্ধরাসূলের (সা.) আদর্শ অনুসরণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব