বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘মক্কা চুক্তি’। মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশীল তিনটি দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। দেশ তিনটি হলো সৌদিআরব,তুরস্ক ও পাকিস্তান। এর মধ্যে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহৎ সেনাবাহিনীর দেশ আর সৌদি আরব হলো বিশ্বের বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথে সারা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অনেকে এই চুক্তিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসাবে অভিহিত করেছেন। এই নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মোদ্দা কথা হলো, একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি দুই দেশ সেই আক্রান্ত দেশের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে ঠিক যেমনটি বলা আছে ন্যাটো চুক্তির পঞ্চম ধারায়। অবশ্য তিন দেশই দাবি করেছে, চুক্তিটি আত্মরক্ষামূলক এবং কোনো বিশেষ দেশের বিরুদ্ধে এটি পরিচালিত হবে না।
আসলে আত্মরক্ষার প্রয়োজন তখনই দেখা দেয়, যখন কোনো দেশ বাইরের কোনো শক্তির আক্রমণের আশঙ্কা করে। প্রশ্ন হলো, মক্কা চুক্তির দেশগুলো কি কোন বহিরাগত শক্তিকে ভয় পাচ্ছে? কারণ চুক্তিটি এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হলো, যখন ইরান ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা তুঙ্গে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের অংশীদার হয়ে পড়েছে সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ।
যদিও ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরোধ নতুন নয়। আয়তন ও জনসংখ্যায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়ে বড়। এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিয়া জনগোষ্ঠী থাকায় তেহরানের শিয়া সরকারকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সবসময় সন্দেহের চোখে দেখে। ইয়েমেনের হুতিদের প্রতি ইরানের লাগাতার সমর্থন সৌদি আরবের সঙ্গে উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে তাদের সম্পর্কের এতটাই অবনতি হয়েছিল যে ২০১৬ সালে রিয়াদ ও তেহরান কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলো। যদিও সাত বছর পর ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সেই সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়। সেই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলো। যুক্তরাষ্ট্রও সেই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে।
ইসলামিক ইরান তাদের জন্য হুমকি এমন ধারণা শুধু সৌদি আরবের নয়, উপসাগরের অন্য দেশগুলোরও। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের দুই বছরের মাথায় ১৯৮১ সালে সৌদি আরবের উদ্যোগে উপসাগরের ছয়টি দেশ একজোট হয়ে জিসিসি বা গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিল গঠন করে। এটিও একধরনের প্রতিরক্ষা জোট, যদিও অভিন্ন প্রতিরক্ষার পাশাপাশি সমন্বিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমও এর অন্তর্ভুক্ত। এই জোটে উপসাগরের সবাই আছে, নেই কেবল ইরান।
জিসিসি গঠন করেও নিজেদের সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপসাগরীয় দেশগুলো একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দিকেও হাত বাড়ায়। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করলে ভীতসন্ত্রস্ত দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেয়। বিনিময়ে যে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তারা আশা করেছিল, চলতি ইরান যুদ্ধের সময় তা অনেকটাই ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ইরানি আক্রমণে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো বিধ্বস্ত হয়ে এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, সেখানকার সেনা ও সরঞ্জাম জর্ডান ও ইসরায়েলে সরিয়ে নিতে হয়।
আগেই বলেছি নিরাপত্তার ভার যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে সৌদি আরব যে স্বস্তি আশা করেছিল, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধে সেই ভরসায় প্রথম বড় ফাটল ধরে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সঙ্গে সংঘাতে তা আরো স্পষ্ট হয়েছে। ফলে রিয়াদ এখন আর নিজের নিরাপত্তা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের উপর ছেড়ে দিতে চায় না বরং একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বলা চলে মক্কা চুক্তি তারই পরবর্তী ধাপ। প্রক্রিয়াটি এখানেই থামবে না, অচিরেই এই তিন দেশের সঙ্গে মিসরও যুক্ত হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ার বাইরে মিসর, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে একটি আলাদা সামরিক–রাজনৈতিক জোটও আকার নিতে শুরু করেছে। চলতি বছরের মার্চে এই চার দেশ প্রথমবারের মতো রিয়াদে বৈঠক করে। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আরও কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। ‘আর ফোর’ বা ‘রিজিওনাল ফোর’ নামে জোটটি ইতিমধ্যেই পরিচিতি পেয়েছে।
মক্কা চুক্তি ও আর ফোর উভয় বন্দোবস্তেরই প্রধান লক্ষ্য সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রিয়াদের চোখে তার জ্বালানি সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে এমন ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগর থেকে বিদায় করা হচ্ছে। বলা চলে যুক্তরাষ্ট্র থাকছে, তবে সেখানে তার উপস্থিতি ও প্রভাব আগের মতো নেই। এককভাবে তার ওপর নির্ভর করাও আর নিরাপদ বলে বিবেচিত হচ্ছে না। এই ঘাটতি পূরণে প্রয়োজন পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং তুরস্কের বিস্তৃত প্রতিরক্ষাশিল্প। যাতে অর্থ জোগানোর দায়িত্ব নেবে রিয়াদ।
কেউ কেউ মনে করছেন, মক্কা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্ষতি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব কমবে, এটি সম্ভবত ভুল। পাকিস্তান ও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ন্যাটোর সদস্য তুরস্কও তার মিত্র। তাই ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা নতুন জোটকে নিজেদের পক্ষের শক্তি হিসেবেই দেখছেন। হয়ত পিছন থেকে তারা এই চুক্তি করার জন্য ইন্ধন দিচ্ছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক দায়িত্ব পালন করে, এই জোট তার একটি অংশ নিতে পারে। তবে পার্থক্য হলো, এর ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রকে একা বহন করতে হবে না।
সব পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, এই চুক্তির লক্ষ্য ইরান নয়। ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক চুক্তি, যা যৌথ প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। অনেকের ধারণা, যেকোনো ইসলামি জোট যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিরোধী হবে। সদস্যরা মুসলিম দেশ হলেও জোটের কৌশলগত লক্ষ্য আরেকটি মুসলিম দেশ ইরান। এতোদিন এই ভাবনা থাকলেও সমপ্রতি ইরানকে এই চুক্তিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং তারা এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তারা বলেছে, ইসলামি জোটটিকে সফল হতে হলে ‘ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ (কমিপ্রহেনসিভ অ্যান্ড ইনক্লুসিভ) হতে হবে।
ইদানীং বিশ্ব মিডিয়ায় বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। যদিও এই চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর ঘোরতর আপত্তি রয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে এবং কোন কোন দেশ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশের সাথে লবিংও করছে ‘মক্কা চুক্তিতে’ বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমপ্রতি সংসদে বলেন “মক্কা চুক্তিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি, এই প্যাক্টে যোগদান করা বা না করা নির্ভর করছে সংস্থাটির বর্তমান সদস্যদের অভিপ্রায়ের উপর। তারা যদি আমাদের যোগদানের বিষয়ে অভিপ্রায় ব্যক্ত করে,তাহলে আমরা এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখবো। তখন এগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারব, এখন এসব বিষয় নিয়ে আলোচোনার সময় আসে নাই। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এই প্যাক্ট যদি বিস্তৃত হয়, তবে এটি হবে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা এবং এটা আমাদের পরিবারের– মুসলিম পরিবারের আভ্যন্তরীণ বিষয়, কাজেই এইটা নিয়ে অন্য কারো উদ্বেগের কোন অবকাশ নাই।” আসলে এবারের যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর চিন্তাচেতনাকে বদলে দিয়েছে।
লেখক : কলামিস্ট












