বাংলাদেশের জনসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময় মানুষ কম ছিল। অপরাধ কম করতো। ভালো লোকের সংখ্যা কম বেশি সব সময় ছিল। তখন জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তিরা ভালোমন্দ প্রকাশ করতো। কিন্তু বর্তমানে নিরাপত্তা ও অপমানের কথা চিন্তা করে অনেকেই কোন ধরনের মতামত প্রকাশ করে না। এদিকে দেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়াতে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্য নেই। মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে গিয়ে অধিকাংশ মানুষকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়। একটা কথা আছে– অভাবে স্বভাব নষ্ট। ফলে শুধু মৌলিক চাহিদা মিটাতে অনেক ধরনের অপরাধ হচ্ছে। কিন্তু চারিত্রিক অধঃপতন কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই ঘুণে ধরা সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিদিন অনেক অঘটন ঘটচ্ছে। রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা সবাইকে নাড়া দেয়। কিন্তু এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে ; রামিসা হত্যার বিচার চলাকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট মেয়ে শিশুদেরকে ধর্ষণ ও হত্যা সংবাদ বার বার প্রকাশিত হচ্ছিল। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। মব কালচারের নামে প্রতিনিয়ত অনেক ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে চলছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন চরম আকার ধারণ করেছে যে নিজের জীবনের নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জীবন ও সম্মানের কথা ভেবে অনেকেই চুপ থেকে যাচ্ছে। কোন ধরনের প্রতিবাদ করছে না। যে যার অবস্থানে নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের পিছনে নানাবিধ কারণের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার অভাব ও মাদকাসক্তি অন্যতম। মাদক সেবনের ফলে এক সময় মাদক সেবীরা বিবেকহীন হয়ে পড়ে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা পরিবারের ক্ষতি করে। সংসারের জিনিসপত্র বিক্রয় করে। অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ও জমির দলিল পর্যন্ত বন্ধক রাখে। সমপ্রতি মাদক সমস্যার উপর পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু কিছু সংবাদ খুবই দুঃখজনক। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ছেলের হাতে মা খুন হয়েছে। আবার কখনো কখনো বাবা খুন হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল অভিভাবকরা তাদের মাদকসেবী সন্তানদেরকে মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রে দিয়ে দেয়। একজন ঐশীর কথা উল্লেখ করতে হয় যে মা–বাবাকে হত্যা করে। অন্যদিকে নিম্মি নিজেই হত্যায় সহযোগিতা করে। পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যা অন্যদিকে স্ত্রীর হাতে স্বামী হত্যা এখন প্রতিদিনের ঘটনা। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে পারিবারিক কলহের জেরে মা বাবা নিজের সন্তানকে নিজ হাতে হত্যা করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হতে জানা যায়; নরসিংদীতে চাচী দুই মাসের বাচ্চার পা ভেঙে দেয়। পরবর্তীতে এই বিষয়টি মিথ্যা বলে তথ্য পাওয়া গেলেও এই ধরনের পোস্টের জন্য অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা উচিৎ। এ আই এর মাধ্যমে প্রকাশিত অনেক অশ্লীল নোংরা বানোয়াট পোস্ট মানুষকে মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সমাজকে অস্থিতিশীল করে রাখে। এ আই দ্বারা নির্মিত ভুয়া পোস্টগুলো সমাজে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। আবার পারিবারিক কলহের জেরে ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জন্য ছোট ছোট শিশুকে হত্যা করার খবর প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য ছোট ছোট ছেলে/মেয়েকে অপহরণ করে হত্যা করছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে পারিবারিক সহিংসতা ঘটছে। এমনকি পরিবারের নারী সদস্যকে অপহরণ ও ধর্ষণ করছে। সমপ্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অবক্ষয়ের দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। একজন শিক্ষকের হাতে আরেকজন শিক্ষককে নির্যাতনের সংবাদ খুবই লজ্জাজনক। এক সময় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে শাসন করার ক্ষেত্রে সচেতন ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। শিক্ষার্থীদেরকে শাসন করতে গিয়ে অনেক শিক্ষক হেনেস্তার শিকার হয়েছে। অতি সমপ্রতি একটি ঘটনা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। একজন অভিভাবক সন্তানকে শাসন করার ফলে তারপরের দিন স্কুলে এসে শিক্ষকের উপর চড়াও হয়। একজন স্কুল শিক্ষিকা কয়েক মাস একজন ছাত্রীকে বাসায় পড়িয়েছেন। মাসিক টাকাটা চাওয়াতে ছাত্রীর মা এসে শিক্ষিকাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আঘাত করে। এবার এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬ এ দুই একটি কেন্দ্রে নকল করতে না দেওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা হামলা করে। কিছু কিছু শিক্ষক রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সহকর্মী; অফিস স্টাফ ও শিক্ষার্থীদেরকে ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট করে।
দূরপাল্লার বাসগুলোও এখন নিরাপদ নয়। অপরাধীদেরকে থানায় নিয়ে আসাতে থানায় এসে পুলিশকে পিটানোর ঘটনা সবাইকে হতভম্ব করেছে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি আর অনিয়ম। বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক প্রকল্প বরাদ্দের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় এনে স্বজনপ্রীতির ঘটনা দুর্নীতি ও অনিয়মকে আরো বেশি বেগবান করছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে প্রবীণ গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে। সেটা অবশ্যই সামাজিক অবক্ষয়ের চরম দৃষ্টান্ত। দুদকের সাথে জড়িত আমলারা বিভিন্ন ধরনের অন্যায়ের সাথে জড়িত হওয়ায় সঠিক তদন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশের নীতি নির্ধারকদেরকে আরও বেশি স্বচ্ছ হতে হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হতে হবে জনকল্যাণমুখী। আমাদের দেশের লেখাপড়ার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ভালো রেজাল্ট করে ভালো জীবিকা উপার্জন করা। কিন্তু লেখাপড়ার আসল উদ্দেশ্য আছে একজন মানবিক মানুষ। এক্ষেত্রে অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদেরকে নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হওয়ার আদর্শগুলো শিক্ষা দেওয়ায় বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার পাশাপাশি সৃজনশীল ও সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে । রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে প্রজন্মকে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে নিশ্চিত জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি ঐক্যবদ্ধ সুশৃঙ্খল সামাজিক অবস্থা সামাজিক অবক্ষয় রোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে ।
লেখক: কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক। অধ্যাপক, ডা. ফজলুল–হাজেরা ডিগ্রী কলেজ।












