দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতার দিকে এগোলেও চাপ পুরোপুরি কাটেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগে দুর্বলতা, রপ্তানিতে স্থবিরতা, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তবে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয় যে, মঙ্গলবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। উন্নয়নশীল অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ অনেক কম উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, দুর্বল সঞ্চালন ব্যবস্থা, নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ধারাবাহিকতার অভাব, জমির সংকট, দুর্নীতি এবং আইন ও বিধিবিধানের অস্বচ্ছ ও অসম প্রয়োগের কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। নতুন সরকারের অধীনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষণ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ দুর্বল থাকলেও সরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান জুনে ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ সুদহার, তারল্য সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক রয়েছেন। এর প্রভাব শিল্প খাতেও পড়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ হয়েছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমেছে।
রাজস্ব আদায়েও বড় ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা আদায় করেছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। যদিও আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। উন্নয়ন ব্যয়ের চিত্রও হতাশাজনক। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। আগের অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। গত কয়েক বছরে যেখানে এ হার ৮০ শতাংশের উপরে ছিল, সেখানে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কমে এ হার এক দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম (জুলাই–সেপ্টেম্বর) প্রান্তিকের প্রাক্কলনে বলা হয়, নির্বাচনের পরে অর্থনীতি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সংঘাতপূর্ণ বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট অসুবিধা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তাই অর্থনৈতিক সূচকগুলোর মিশ্র পারফরম্যান্স দেখা যাচ্ছে। আগামী তিন মাসে রপ্তানি, আমদানি এবং রেমিট্যান্স বাড়তে পারে। এ অবস্থায় আগামী দিনের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানো এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, রপ্তানি বাণিজ্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম উৎস। যেকোনো বিকাশমান দেশের জন্যই বৈদেশিক মুদ্রায় আয় সক্ষমতা বৃদ্ধি সমৃদ্ধি বাড়ায়। ইদানীং বৈশ্বিক নানা বাধা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
রপ্তানির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের আরেক অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়। এ দুই উৎস দেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স যত বাড়ে, ততই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে। ফলে দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়। তা ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যত শক্তিশালী হয়, ততই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা উন্নত হয়।
ফলে টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়। রপ্তানি আয় হ্রাস পেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রভাব কমবে ও দেশের রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে। এতে ডলার–সংকট দেখা দেবে। আমদানি ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ ও মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন জায়গায় যে অস্থিরতা আছে, সেখানে যেন একটা গতি ও স্থিতিশীলতা আসে। মানুষের প্রত্যাশা শুধু সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে নয়; অর্থনৈতিক জীবনেও স্বস্তি ফিরে আসবে।








