বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সামপ্রতিক সময়ে গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানা ব্যাহত হচ্ছে। দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০–৪,০০০ এমএমসিএফডি হলেও সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আজারবাইজানের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ হতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান SOCAR ইতোমধ্যে বাংলাদেশে একটি FSRU/ভাসমান LNG টার্মিনাল স্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি LNG সরবরাহে আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রস্তাবিত সহযোগিতাকে শুধু LNG আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি, অনুসন্ধান, দক্ষ জনবল, অবকাঠামো ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বে রূপ দেওয়া যেতে পারে। তবে আমদানি–নির্ভরতা কমানোই হওয়া উচিত বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির মূল লক্ষ্য। এজন্য স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, আধুনিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ, offshore bidding, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি–সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং দেশীয় সম্পদের দক্ষ ব্যবহারে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ২৬টি offshore ব্লকে অনুসন্ধানের সুযোগ উন্মুক্ত করেছে এবং দেশের অবশিষ্ট গ্যাস মজুদেরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রয়েছে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা শুধু গ্যাস বা বিদ্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান বাড়িয়ে তেল–গ্যাস, কয়লা, পাথর, বালু, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের প্রকৃত সম্ভাবনা নিরূপণ করা প্রয়োজন। সম্ভাব্য সম্পদকে প্রমাণিত মজুদ হিসেবে নয়, বরং অনুসন্ধানযোগ্য জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করতে হবে। এ কাজে Geological Survey of Bangladesh–সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ প্রকৌশলী ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সহযোগিতায় শক্তিশালী করা জরুরি। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তার বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি, যোগাযোগ ও নির্মাণ অবকাঠামোর সমপ্রসারণ, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় রাজস্ব বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত হবে। একই সঙ্গে দক্ষ প্রকৌশলী, কারিগরি জনবল, গবেষক, পরিকল্পনাবিদ ও অভিজ্ঞ পরামর্শকদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রায় ১৭.৬ কোটি মানুষের বিশাল জনগোষ্ঠীকে কেবল চাপ নয়, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে এটি অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে। শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান–প্রযুক্তি, গবেষণা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত করাই হবে টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের GDP প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু এউচ প্রায় ২,৫৯৭ ডলার। এর পাশাপাশি প্রয়োজন সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার আমূল উন্নয়ন সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার, অপচয় ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থ ও মেধা পাচার রোধ, যোগ্যতার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ ও মূল্যায়ন, দক্ষ জনপ্রশাসন, আইনের শাসন, সমন্বিত সরকারি সেবা, কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিবেশ।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, পর্যটন, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নীল অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উন্নয়নও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সঠিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দেশপ্রেম, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে বাংলাদেশের বৃহৎ জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান ও সম্ভাব্য প্রাকৃতিক সম্পদকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
অতএব লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু আজকের গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা নয়; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধান, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও সুশাসনের সমন্বয়ে একটি উৎপাদনশীল ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা। পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে এগোতে পারলে আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ আরও উচ্চ আয়ের অর্থনীতির পথে দ্রুত অগ্রসর হতে পারে।
লেখক : পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ।











