মানবপাচার প্রতিরোধে দরকার আত্মসচেতনতা

| শনিবার , ২২ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ

খাবার ও পানি ছাড়া ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১১ দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসগামী একটি নৌকায় অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি বলে জানিয়েছেন বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশি। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, মিশরে চিকিৎসাধীন ওই বাংলাদেশির বরাতে কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দূতাবাসের কর্মকর্তারা স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে তারা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বেঁচে যাওয়া সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আবদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

দূতাবাসকে দেওয়া করিমের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট ৪২ জন যাত্রী লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হন। পরে ভূমধ্যসাগরে নৌকাটি ভেঙে যায় এবং এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট তারা মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছান। জাকির হোসেন বলেন, স্থানীয় লোকজন নৌকাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে প্রায় ২৯৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের অনেকেই অচেতন ছিলেন। তাদের দুটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশি তরুণদের করুণ মৃত্যু আবার প্রমাণ করল, মানব পাচার বন্ধ ও নিরাপদ অভিবাসনের মতো জরুরি বিষয়গুলো আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো কতটা উপেক্ষিত। বাংলাদেশের বৈষম্যমূলক অর্থনীতি সিংহভাগ তরুণের জন্য ভদ্রস্থ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছে না। এই রূঢ় বাস্তবতাও অনেক তরুণকে জীবন বাজি ধরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে প্ররোচিত করছে। এরই সুযোগ নিচ্ছে পাচারকারী চক্র।

উল্লেখ্য করা প্রয়োজন, লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অভিবাসন চেষ্টাকালে এ বছর এটি দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনা। এর আগে মার্চ মাসে ইতালি যাওয়ার সময় ১৮ জন বাংলাদেশি তরুণ মারা গিয়েছিলেন।

মানব পাচার বিশ্বব্যাপী একটি সমস্যা এবং একটি ঘৃণ্য অপরাধও বটে। পাচারের শিকার মানুষদের মানবাধিকার নানাভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রতিবছর পাচারের শিকার হয়ে সারা বিশ্বে অনেক মানুষের জীবনে সর্বনাশ ঘটছে। জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) মানব পাচারের তথ্যউপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পাচারের শিকার প্রতি তিনজনের একজন শিশু। তারা অনেকেই যৌন নিপীড়ন ও জোরপূর্বক কায়িক শ্রম দিতে বাধ্য হয়। তাই এটাকে কেউ কেউ ‘আধুনিক দাসত্ব’ বলছেন। ইউএনওডিসির মতে, সারা বিশ্বের কোথাও না কোথাও মানুষ নানাভাবে পাচারের শিকার হচ্ছে, অর্থাৎ পৃথিবীর কোনোস্থানেই মানুষ পাচারকারীর খপ্পর থেকে নিরাপদ নয়। জাতিসংঘের এই সংস্থাটির মতে, পাচারের শিকারের অধিকাংশ অর্থাৎ ৭০ ভাগ নারী ও শিশু।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচারের কারণসমূহের মধ্যে অতি দ্রুত পরিবারে সচ্ছলতা নিয়ে আসার চিন্তা অন্যতম। সাধারণত দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনবলের এরূপ স্বপ্ন দেখাপাচারের ক্ষেত্রে বড়ই সহায়ক। তবে পাচারের কারণসমূহের মধ্যে বেকারত্ব সমস্যা অন্যতম। বর্তমানে সরকারি চাকরি পাওয়া যেন বিরাট ব্যাপার। দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা হতে শিক্ষা শেষে অধিকাংশ তরুণযুবক চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না পাওয়ায়, তাদের উন্নত দেশের প্রতি বিশেষ ঝোঁক দেখা যায়।

বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছে। যার মাঝে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চাকরির প্রলোভন, উন্নত জীবনের স্বপ্ন, সুযোগসুবিধা প্রদান, ভালো পরিবেশের নিশ্চয়তা পাচারকারীদের মুখের বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ হতে সাধারণত প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ সৌদি আরবে পাচারের ঘটনা দেখা যায়। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে অভিবাসীদের গণকবর ও ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশিদের সলিলসমাধিমানবপাচার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। পাচার শিকার কেউ হয়ত ফিরে আসে, কেউ হয়ত কখনো ফিরে আসে না। অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে তাদের স্বজনরা।

মানবপাচার নির্মূল করা সম্ভব না হলেও, একে সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য আমাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। মানবপাচার রোধে সর্বপ্রথম প্রয়োজন আত্মসচেতনতা। আত্মসচেতনতাই মানবপাচারকে রুখে দিতে পারে। বিদেশে গমনেচ্ছু কর্মীদের আত্মসচেতন হতে হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাপ্ত অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক। অজ্ঞতাকে ছুড়ে ফেলে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরপর সামাজিক সচেতনতা মানবপাচার বন্ধে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধঅরুণ মিত্র : কবি ও অনুবাদক