চট্টগ্রামে আগস্টের শুরু থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এ নিয়ে নগর ও জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সামপ্রতিক এক জরিপে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বও আশঙ্কাজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, আগস্টের প্রথম ১১ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬১। বর্তমানে সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১৪২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।
চট্টগ্রামে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২২ সালের জুলাই–অক্টোবর সময়ে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২ হাজার ৬৪০ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৩ জনে। ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৩৭ এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬০ জন আক্রান্ত হন।
চলতি বছরও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬, এ মাসে দুজনের মৃত্যুও হয়েছে। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় মোট ১ হাজার ১৯৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন তিনজন। বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি সীতাকুণ্ডে ১২৮ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ৯০ জন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জুলাই ও আগস্টের প্রথম দিকের আক্রান্তের সংখ্যা আগের ছয় মাসের মোট আক্রান্তের প্রায় দ্বিগুণ। তিনি বলেন, বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। বিভিন্ন উপজেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও ৯৯ শতাংশের বেশি রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। মারা যাওয়া তিনজনই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেরি করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশা জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। তাই বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান তাঁরা। এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) সামপ্রতিক প্রাক–বর্ষা জরিপে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব আশঙ্কাজনকভাবে বেশি পাওয়া গেছে। জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জরিপে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে। কনটেইনার ইনডেক্স (সিআই) পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স (এইচআই) ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। আর ব্রেটো ইনডেক্স (বিআই) পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।
জরিপের নেতৃত্ব দেওয়া বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ জানান, চট্টগ্রাম নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো উত্তর কাট্টলী (১০ নম্বর ওয়ার্ড), পাঁচলাইশ (৩), জালালাবাদ (২), পশ্চিম বাকলিয়া (১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (১৯), পাথরঘাটা (৩৪), আন্দরকিল্লা (৩২) ও দক্ষিণ হালিশহর (৩৯)।
জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির বলে জানান মফিজুল। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানির পাত্র এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলোকে এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি জানান, জরিপের ভিত্তিতে তিন দিনের মধ্যে জমে থাকা পানি অপসারণ, বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা, নির্মাণাধীন স্থাপনায় নিয়মিত নজরদারি এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও জনপদে জমে থাকা পানি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, ছাদ ও নালা–নর্দমায় মশার বংশবিস্তার অব্যাহত রয়েছে। মশক নিধন কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত ও সমন্বিত নয়। কোথাও ওষুধ ছিটানো হলেও উৎস ধ্বংসের উদ্যোগ দুর্বল। ফলে একদিকে মশা নিধনে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে সংক্রমণও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চলবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের ব্যবস্থা করতে হবে।








