দূরের দুরবিনে

হাসান আকবর | বুধবার , ১৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

এয়ারপোর্ট বাস থেকে স্টেশনে নেমেই জায়গাটি চিনতে পারলাম। গতবারও এই স্টেশনটি অসংখ্যবার ব্যবহার করেছি। পাশের এমআরটি স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে গিয়ে হংকংয়ের নানা গন্তব্যে। বাস স্টেশনে খুব বেশি মানুষজন নেই, তবে ট্রেন স্টেশনে লোকজন বেশি। হংকং বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, নিয়ন আলোর ঝলকানি, ব্যস্ত রাস্তা, শপিং মল আর মানুষের অবিরাম ছুটে চলা। কিন্তু শহর থেকে কিছুটা দূরে একেবারে অন্যরকমের একটি আবহ বিরাজ করছে কাম শেং নামের এলাকাটিতে। সবুজ পাহাড়, খোলা আকাশ, পুরোনো দিনের বাড়িঘর মিলে দারুণ শান্ত এক জনপদ। আমার বন্ধু ইউছুপ আলী শহরের ব্যস্ত এলাকার পরিবর্তে কিছুটা দূরে একেবারে নিরিবিলিতে গড়ে ওঠা পরিকল্পিত একটি আবাসিক এলাকায় দারুণ একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি কিনে বসবাস করতেন। ডুপ্লেক্স বাড়িটিকে তিনি পরবর্তীতে ট্রিপলেক্স করে নিয়েছিলেন। আগের বার হংকং সফরকালে আমার বন্ধু বড়সড় ওই রুমটিতে আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন। ওখান থেকেই চষে বেড়িয়েছিলাম পুরো হংকং। কখনো বন্ধুর গাড়িতে, কখনোবা আবাসিক এলাকার বাসে চড়ে এমআরটি স্টেশন থেকে ট্রেনে। আবাসিক এলাকাটির নিজস্ব গাড়ি রয়েছে, বাস। প্রতি ১৫ মিনিট পরপর বাস এবং এমআরটি স্টেশনে বাস যাতায়াত করে। আবাসিক এলাকা থেকে ৫ মিনিটে পৌঁছানো যায় বাস বা ট্রেন স্টেশনে, ওখান থেকে যেখানে খুশী সেখানকার বাস বা ট্রেনে চড়ে যাতায়ত করা যায়। অর্থাৎ আবাসিক এলাকাটি মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই দূরত্বকে দূরত্ব মনে হয় না, মনে হয় না শহর থেকে দূরে রয়েছি।

আমি বাস থেকে যেখানে নেমেছি তার পাশেই এমআরটি স্টেশন।

হংকংয়ের এমআরটি পৃথিবীর অন্যতম সেরা এমআরটি হিসেবে স্বীকৃত। রাতে দিনে চব্বিশ ঘন্টাই এই ট্রেন চলে, মানুষ ছুটে। তবে রাত বাড়ার সাথে সাথে ট্রেনের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়।

বাস স্টেশনটি ট্রেন স্টেশনের সন্নিকটেই। কয়েক লেনের রাস্তা। প্রতিটি বাসের জন্য আলাদা আলাদা লেইন। কত নম্বর বাস কোন লেনে দাঁড়াবে, বাসটি কোথায় যাবে তার সবই একটি স্টিল পিলারে সাঁটানো সাইনবোর্ডে লিখে রাখা হয়েছে।

আমি চিনতে পারলাম যে, এখান থেকে আবাসিক এলাকার বাসটিতে চড়লে ৫ মিনিটের মধ্যে ইউছুপ আলী ভাইয়ের বাড়িতে পৌঁছে যাবো। তবে ভাবী যেহেতু মেয়েকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়েছেন তাই বাস না খুঁজে আমি গাড়ির খোঁজ করলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই গাড়ি পেয়ে গেলাম। স্টিয়ারিং সিটে আমার বন্ধুর মেয়ে, দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া সেই ড্রাইভারও আছে। আমার লাগেজ গাড়িতে তোলা হলো। আমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করে এতোদূর নিয়ে আসা বন্ধু খায়রুল ইসলাম নিজামী স্বপনকে সাথে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। কিন্তু তার কি একটা জরুরি ব্যবসায়ীক মিটিং থাকায় এখান থেকেই বিদায় নিল। বললো, ফোনে কথা বলে পরবর্তী সিডিউল ঠিক করে নেবে।

বন্ধু স্বপন চলে গেলো, আমরাও বাড়ির পথ ধরলাম। আমার বন্ধুর বড় মেয়ে উরবানা। হংকং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করেছে। তার ড্রাইভিং লাইসেন্স এখনো পোক্ত হয়নি। লার্নারের পরে এক ধাপ পার হয়েছে, আরো এক ধাপ পার হলেই কেবল সে হংকংয়ের রাস্তায় দাপটের সাথে গাড়ি চালাতে পারবে। আমি খেয়াল করে দেখলাম যে, উরবানা বেশ সতর্কতার সাথে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে। টুকটাক বাংলা এবং ইংরেজি মিলিয়ে আমার সাথে গল্প করছিলো উরবানা।

৫ মিনিটের মধ্যে আমরা বাড়ির সামনে পৌঁছে গেলাম। সবই পরিচিত লাগছিল। সবই ঠিকঠাক রয়েছে, শুধু আমার বন্ধু নেই। রাজকীয় এক জীবনের সবকিছু পেছনে রেখে খুবই অল্পবয়সেই আমার বন্ধুটি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। বন্ধুর কবর জেয়ারত করতে আসা যে কত কষ্টের তা যেনো আমি ভিতরে নিদারুণভাবে টের পেতে শুরু করলাম।

ভাবী নিচেই অপেক্ষা করছিলেন। অপেক্ষা করছিলেন আমার বন্ধুর ছোট মেয়ে ফাইজা। সেও হংকংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমার বন্ধুর একমাত্র ছেলে ইয়াস অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বাড়িতেই অবস্থান করছিলো। সবাই ড্রয়িং রুমে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। ঘরে ঢুকেই আমার চোখ চলে গেলো সেই সোফায় যেখানে গতবার আমার বন্ধুকে গায়ে একটি চাদর জড়িয়ে সারাক্ষণই বসে থাকতে দেখতাম। সোফাটি খালি পড়ে রয়েছে। মনটি খারাপ হয়ে গেলো।

কিছুক্ষণ গল্প করার পর ভাবী আমাকে বললেন, ভাই, আপনার জন্য উপরের রুমটি রেডি করে রেখেছি। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। ততক্ষনে টেবিলে খাবার দেয়া হয়ে যাবে। আমি বললাম, ভাবী হোটেল হলেই আমার জন্য ভালো হতো। এখানে ধারে কাছে একটি হোটেল ঠিক করে দিলেই তো হতো।

ভাবী বললেন, আপনার বন্ধু নাই তো কি হয়েছে, তার ছেলে মেয়েরা আছে, আমি আছি। আমরা থাকতে আপনি হোটেলে থাকবেন কেন? ঘরতো খালিই পড়ে থাকে। আপনাদের জন্যই সে ঘরটি ছাদের উপর তৈরি করেছিল। আপনি গতবার যেভাবে ছিলেন এবারও সেভাবেই থাকবেন। বন্ধু নেই বলে বিব্রত বোধ করার কিছু নেই।

আমি রুমে চলে গেলাম। সেই রুম, সেই খাট, সেই ওয়্যারড্রপ। সবই আগের মতো আছে। গতবারও এখানে টানা কয়েকদিন থেকে বন্ধুর সাথে গল্পে আড্ডায় সুন্দর কিছু স্মৃতি জমিয়েছিলাম। আমি আসবো এজন্য রুমটিকে চমৎকার করে গুছিয়ে রাখা হয়েছে।

ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসলাম। ঘরের ভিতর দিয়েই সিঁড়ি। তাই কিছুটা বিব্রত হচ্ছিলাম। কাঠের ঘোরানো সিঁড়িতে শব্দ করে করেই আমি নিচে নামছিলাম। ড্রয়িং রুমের পাশেই ডাইনিং। টেবিলে খাবার সার্ভ করা হয়েছে। অনেকদিন পর দেশীয় স্বাদের খাবার। ভাবী বললেন, আপনি তো দেশ ছেড়েছেন অনেকদিন। তাই বুঝতে পেরে দেশীয় রান্নাবান্না করিয়েছি। পরে এখানকার খাবার খাওয়াবো। সত্যি বলতে কি, আমরা সবাই মিলে গল্পে গল্পে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া করলাম। কথায় কথায় আমার হংকং আসার উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভাবীকে বললাম, ইয়াসকে নিয়ে আমি একটু ইউছুপ ভাইয়ের কবর জেয়ারত করতে যেতে চাই। উবার নিয়ে চলে যাবো। সমস্যা হবে না।

বুঝতে পারলাম যে, ভাবী একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বললেন, অবশ্যই যাবেন, তবে আজ পারবেন না। আমি ব্যবস্থা করে দেবো। কাল যাবেন। আমি মাথা নাড়লাম।

শরীর আসলে চলছিলো না। খুবই টায়ার্ড লাগছিল। খাওয়ার পর আরো একটু বেশি টায়ার্ড ফিল করছিলাম। টানা প্রায় সাড়ে ৯ ঘন্টার বিমানযাত্রা। সিডনি থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। বুঝতে পারছিলাম যে, বিছানায় পড়লেই ঘুমিয়ে যাবো।

সকালে যখন ঘুম ভাঙলো তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। কিছুটা লজ্জা লাগলেও সিঁড়িতে ঠকঠক করতে করতে নিচে নামলাম। ভাবী ছেলে মেয়েদের নিয়ে নাস্তা না করেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

নাস্তার টেবিলে ভাবী বললেন, টিপু ভাই আসবে, আপনি ইয়াসকে নিয়ে কবরস্থানে যাবেন। আমরা আজ যাবো না। অফিসে কিছু কাজ আছে। আপনারা জেয়ারত করে ফিরতে ফিরতে আমি উরবানাকে নিয়ে অফিস থেকে চলে আসবো।

আমার বন্ধু ইউছুপ আলী ভাই মারা যাওয়ার পর ভাবীই ব্যবসা সামলাচ্ছেন, অফিস করছেন। উরবানাও ভাবীর সাথে অফিসে বসে। টিপু ভাই ভাবীর ছোটবোনের স্বামী। তিনিও অফিসে বসেন, সবদিক সামলে রাখেন।

ঘন্টা খানেকের মধ্যেই টিপু ভাই ফোন করে ভাবীকে জানালেন যে, তিনি স্টেশনে অপেক্ষা করবেন। আমি এবং ইয়াস যেনো স্টেশনে পৌঁছি। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম যে, স্টেশনে যেতে হবে কেন? কবরস্থান কত দূরে!

কথাটি ভাবীকে বলতেই তিনি একটু হাসলেন। বললেন, ভাই, অনেক দূর। এখানে তো যেখানে সেখানে কবরস্থান করার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট কবরস্থানেই দাফন করতে হয়।’

করোনাকালে বিমান যোগাযোগ বন্ধ থাকায় আমার বন্ধুকে সীতাকুণ্ডের গ্রামের বাড়িতে আনা যায়নি, ওখানেই দাফন করতে হয়েছে। কবরস্থানটি বাড়ি থেকে অনেক দূরে, প্রায় দুই ঘন্টা সময় লাগে পৌঁছাতে। বন্ধুপুত্র ইয়াসের কাঁধে হাত রেখে মন খারাপ ভাব নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম, কিন্তু ভালো লাগছিলো যে, দূরে হলেও তো বন্ধুর কাছে যাচ্ছি। কতদিন পর প্রিয় বন্ধুর সাথে আত্মিক দেখাটা অন্তত হবে! (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসঠিক লক্ষ্যে ঈদে আজম উদযাপন করুন, দ্বীন-মিল্লাত-মানবতা রক্ষা করুন
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ