মাত্র ১৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসে চলছে চট্টগ্রাম। এর মধ্যে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) একাই নিচ্ছে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে আরও প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট সরবরাহের প্রায় ৫৯ শতাংশই চলে যাচ্ছে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। অবশিষ্ট প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চলছে। ফলে নগরীর রান্নাঘর থেকে শিল্পকারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে ব্যবসা বাণিজ্য–সবখানেই তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট। অর্থাৎ চুলা, চাকা, কারখানা–সবখখানেই হাহাকার চলছে।
গ্যাসের ভয়াবহ সংকটে গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামের ষোলশহরে সিএনজিচালিত টেক্সিচালকরা সড়ক অবরোধ করেছে। চালকদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ফিলিং স্টেশনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে গ্যাস পাননি। ষোলশহরের একটি স্টেশনের সামনে শুক্রবার ভোরে কয়েকশ টেক্সির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। দীর্ঘ অপেক্ষায় অতিষ্ঠ চালকেরা একপর্যায়ে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে মুরাদপুর থেকে দুই নম্বর গেট পর্যন্ত যান চলাচলও ব্যাহত হয়। খুলশী রেলক্রসিং সংলগ্ন সিএনজি স্টেশনে আগেরদিন লাইনে দাঁড়ানো টেক্সি এবং গ্যাসচালিত গাড়ি দেখা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে গ্যাসের এই সংকট নতুন নয়। তবে সামপ্রতিক সময়ে সরবরাহ নজিরবিহীনভাবে কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে কয়েক দিন আগেও সরবরাহ ২১৭, পরে ২০০ এবং সর্বশেষ ১৯৪ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছিল। এখন সরবরাহ আরও কমে ১৫৩ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসায় সংকটের মাত্রা আরও ভয়াবহ হয়েছে। ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের স্বাভাবিক চাহিদার সঙ্গে তুলনা করলে ১৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট, অর্থাৎ চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি চট্টগ্রামের চাহিদা ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ধরে হিসাব করলেও বর্তমান সরবরাহ স্বাভাবিক প্রয়োজনের অর্ধেকেরও কম। ২০২৫ সালের কেজিডিসিএল–সংক্রান্ত তথ্যেও চট্টগ্রামের দৈনিক চাহিদা ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বলা হয়েছিল।
এই অপ্রতুল সরবরাহের মধ্যেও কাফকোকে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট দেওয়ার পর অন্যান্য খাতের জন্য কার্যত খুব সামান্য গ্যাস অবশিষ্ট থাকছে। ফলে গৃহস্থালি গ্রাহক, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সিএনজি স্টেশনগুলোকে একই সংকুচিত সরবরাহের মধ্যে ভাগ বসাতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ এখন চরমে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভোরের পর গ্যাসের চাপ একেবারে কমে যাচ্ছে। কোথাও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চুলা জ্বলছে না, কোথাও দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা, এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা হোটেল–রেস্তোরার খাবারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার গ্যাস না থাকায় হোটেল রেস্তোরাগুলোও খাবার তৈরি করতে পারছে না। নগরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস না থাকায় পরিবারগুলোকে দুপুরের রান্না বিকেলে কিংবা গভীর রাতে করতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের গ্যাস সংকটের অভিঘাত সবচেয়ে তীব্র শিল্পাঞ্চলে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বড় শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে, আবার কোথাও গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইস্পাত, সিমেন্ট, টেঙটাইল, পোশাক, জাহাজ নির্মাণ ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পে সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে শিল্পের বয়লার, চুল্লি ও অন্যান্য উৎপাদনযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালানো যায় না। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ ও রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকেও গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে পরিস্থিতি কার্যত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে ফিলিং স্টেশনগুলোতে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। ফলে স্টেশনগুলোতে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে গ্যাসের চাপের রিডিং প্রায় ২২০ থাকত, গ্যাস সংকটের কারণে তা ১৫০ এ নেমে এসেছে।
এই অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নগর পরিবহন ব্যবস্থায়। হাজার হাজার সিএনজিচালিত টেঙি ও অন্যান্য যানবাহন দিনের একটি বড় অংশ গ্যাস নেওয়ার লাইনে কাটাচ্ছে। ফলে যাত্রী পরিবহনে গাড়ির সংখ্যা কমছে, ভাড়া বাড়ছে এবং চালকদের আয় কমে যাচ্ছে। গতকাল শুক্রবার গ্যাস না পেয়ে চালকেরা সড়ক অবরোধ করে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পন্থা বের করার দাবি জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রামের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন কমাতে হচ্ছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে রাতে দিনে লোডশেডিং করা হচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট চট্টগ্রামে শুধু গ্যাসের সংকটই নয়, একইসাথে বিদ্যুতেরও দফারফা করে ছাড়ছে।
চট্টগ্রামের জন্য গ্যাস সরবরাহ এতটা কমে গেল কেন–এমন প্রশ্নের জবাবে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টর পুরোপুরি আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভর। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে সংকট দেখা দেয়ায় চট্টগ্রামে হাহাকার শুরু হয়েছে। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এঙিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর কারিগরি ত্রুটি মেরামত করে টার্মিনাল থেকে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও এখনো স্বাভাবিক সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এরমধ্যে অপর ভাসমান টার্মিনাল সামিটের এলএনজি গ্রহণ করা যাচ্ছে না। সামিট অ্যালায়েন্স এমন একটি জাহাজে এলএনজি আমদানি করেছে যে, সেটি থেকে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালে গ্যাস রিসিভ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সামিট দৈনিক যে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ দেয় তা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের অর্থনীতি, শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সবই আমদানিকৃত এলএনজি–নির্ভর। ২০২৫ সালের কেজিডিসিএল–সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ছয় লাখের বেশি গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে শিল্প, আবাসিক, বাণিজ্যিক, ক্যাপটিভ পাওয়ার, সিএনজি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা রয়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বড় ধরনের ঘাটতিও একসঙ্গে বহু খাতে সংকট তৈরি করে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেছেন, সামিট অপর একটি এলএনজি কার্গো নিয়ে এসেছে। সেটি যদি আজ ভাসমান টার্মিনালে সংযুক্ত করতে পারে তাহলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহে এলএনজির ওপর পুরোপুরি নির্ভরতা চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে। মহেশখালীর টার্মিনালগুলোর কোনো একটিতে অগ্নিকাণ্ড, কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা এলএনজি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলেই চট্টগ্রামের গ্যাসব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। এ অবস্থায় চট্টগ্রামের গ্যাস সংকটে কারখানার চাকা থামে, সিএনজি না থাকলে নগর পরিবহন ব্যাহত হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে, আর বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পের উৎপাদন আরও ব্যাহত হয়। অর্থাৎ একই সংকটের অভিঘাত এক খাত থেকে আরেক খাতে ছড়িয়ে পড়ে পুরো নগর অর্থনীতিকে ভয়াবহ রকমের চাপে ফেলছে।
চট্টগ্রামে বিরাজমান পরিস্থিতি তাই সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে। সাময়িকভাবে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়া গেলেও ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসিক খাতকে এ ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ, এলএনজি টার্মিনালের বিকল্প সক্ষমতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে খাতভিত্তিক বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় অ্যকশন প্ল্যান এবং অবকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।











