ডারউইনে বাংলাদেশের স্বপ্নময় দিন

হাসানের ক্যারিয়ার সেরা পারফরম্যান্সে ৬ উইকেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক | শুক্রবার , ১৪ আগস্ট, ২০২৬ at ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ছয়টায় শুরু ডারউইন টেস্ট। খুব সকাল বলে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে অনেকেই হয়তো প্রথমে বিভ্রমে পড়েছিলেন, স্বপ্ন দেখছেন না তো! সময় গড়ানোর সঙ্গে সেই বিস্ময় বেড়েছে। দিন শেষে বিস্ময়টা রূপ নিয়েছে আনন্দে। অনেক শঙ্কা, ভয় ও দুর্ভাবনা সঙ্গে নিয়ে শুরু হওয়া ম্যাচের প্রথম দিনেই বাংলাদেশ পেয়েছে অভাবনীয় এক প্রাপ্তি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে প্রথম দিনটিই দাপটে রাঙিয়েছে বাংলাদেশ। ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে দিন শেষ করেছে ১ উইকেটে ৯৬ রান নিয়ে। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা দিনগুলোর একটি হয়ে থাকল গতকাল। আর সেই দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হাসান মাহমুদ।

নিখুঁত লাইনলেংথ, ছোট ছোট সুইং ও মুভমেন্টে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের নাস্তানাবুদ করেছেন এই পেসার। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ৫৫ রানে নিয়েছেন ৬ উইকেট। টেস্ট তো বটেই, তিন সংস্করণ মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাঁচ উইকেট নেওয়া বাংলাদেশের প্রথম বোলারও তিনি। ২৬ বছর বয়সী পেসারের এটি টেস্ট ইনিংসে তৃতীয়বার পাঁচ উইকেট। এর আগে ভারত ও পাকিস্তানে এই কীর্তি গড়েছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের পেস আক্রমণের অন্য দুই সদস্য তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন চৌধুরীও ছিলেন কার্যকর। প্রথম স্পেলে একটু এলোমেলো থাকলেও পরে পুষিয়ে দিয়ে দুটি উইকেট নেন তাসকিন। নাহিদ রানা ও শরিফুল ইসলামের চোটে হঠাৎ দলে ডাক পাওয়া ইবাদতও নেন দুটি উইকেট। এই সফরে তার থাকারই কথা ছিল না। সম্ভানসম্ভবা স্ত্রীর সঙ্গে ছুটিতে ইতালিতে ছিলেন তিনি। জরুরি তলবে সাড়া দিয়ে ডারউইনে নেমেই পুরোনো আগুনের ঝলক দেখিয়েছেন ইবাদত।

মারারা স্টেডিয়ামের উইকেট ছিল সবুজ ঘাসে ভরা। টস জিতে তবু ব্যাটিং নেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ওপেনারদের পরীক্ষা নেন হাসান। তাসকিনের বোলিংয়ে ছিল ভালোমন্দের মিশেল। দুই ব্যাটারই কয়েক দফা অল্পের জন্য রক্ষা পান। প্রথম ১০ ওভার পার করেন ট্রাভিস হেড ও জেইক ওয়েডারল্ড। ম্যাচের দ্বিতীয় বলেই বাউন্ডারি মেরে শুরু করলেও বিপজ্জনক হেডকে হাত খুলতে দেননি বাংলাদেশের বোলাররা। ১০ ওভার শেষে ৩১ বলে তার রান ছিল ১০। টেকনিক ও স্টান্সে কিছুটা পরিবর্তন আনা ওয়েডারল্ড ছিলেন তুলনামূলক আক্রমণাত্মক। আউটও হন তিনিই আগে। হাসানের বেশ বাইরের বল তাড়া করে কিপারের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। ৪৫ রানে থামে অস্ট্রেলিয়ার উদ্বোধনী জুটি।

পরের ওভারেই হেডকে ফেরান হাসান। বাউন্ডারি হজমের পর রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে অ্যাঙ্গেল বদলে করা বলটি স্টাম্পে টেনে আনেন এই আগ্রাসী ব্যাটার। টানা সাত ওভারের স্পেলে অস্ট্রেলিয়ানদের ভুগিয়ে একটু বিরতি নেন হাসান। তখন তাদের চাপে রাখেন ইবাদত। তার বলে স্লিপে স্মিথের সহজ ক্যাচ ছাড়েন তানজিদ হাসান। তবে অন্য প্রান্তে উইকেটের দেখা পান ইবাদত, ধুঁকতে থাকা মার্নাস লাবুশেনকে ফেরান তিনি। ২০ বল খেলে ১ রান করেন অভিজ্ঞ ব্যাটার। ক্যামেরন গ্রিন ক্রিজে গিয়েই তাসকিনকে পুল করে ছক্কা মারেন। ওই ওভারেই তাকে ফিরিয়ে জবাব দেন অভিজ্ঞ পেসার। চার উইকেট নিয়ে লাঞ্চে যায় বাংলাদেশ।

গোটা দিনে অস্ট্রেলিয়ার সেরা সময়টা আসে লাঞ্চের পর প্রথম ঘণ্টায়। দাপটে ব্যাট করতে থাকেন স্মিথ ও অ্যালেঙ কেয়ারি। ইনিংসের একমাত্র অর্ধশত রানের জুটিও গড়েন তারা। ৭৬ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন স্মিথ। ৭১ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে বড় বিপদ থেকে কিছুটা উদ্ধার করেন তিনি। তবে ২ রানে জীবন না পেলে ইনিংসের চিত্র হয়তো অন্য রকম হতে পারত। পরের ঘণ্টায় দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। পানি পানের বিরতির পর প্রথম বলেই কেয়ারিকে বোল্ড করে ৫৫ রানের জুটি ভাঙেন ইবাদত। এরপর দিনের সেরা ডেলিভারিগুলোর একটিতে বাউ ওয়েবস্টারের অফ স্টাম্প উড়িয়ে দেন তাসকিন।

এরপর ইনিংসের বাকিটা হাসানের। চা বিরতির আগে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক কামিন্সকে ফেরান তিনি। বিরতির পর দারুণ ডেলিভারিতে বিদায় করেন মিচেল স্টার্ককে। পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন সবচেয়ে বড় উইকেটটি নিয়ে। ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে বড় শটের চেষ্টা করেন স্মিথ। সেটি বুঝতে পেরে লেংথ টেনে দেন হাসান। সহজ ক্যাচটি নেন কিপার লিটন। এরপর শেষ উইকেটটিও দ্রুত তুলে নেন তিনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথমবার দুইশর নিচে থামে অস্ট্রেলিয়া।

উইকেট তখনও ছিল যথেষ্ট প্রাণবন্ত। অস্ট্রেলিয়ার ভয়ংকর পেসত্রয়ীর সামনে বাংলাদেশের ভঙ্গুর টপ অর্ডার নিয়ে তাই শঙ্কা ছিল। দ্বিতীয় ওভারে জশ হেইজেলউডকে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান তানজিদ হাসান। এরপর তানজিদ ও সাদমান ইসলাম শুধু শুরুটা নিরাপদেই কাটাননি, ৮ ওভারে তুলে নেন ৩৫ রান। তাতে কেটে যায় শুরুর স্নায়ুর চাপ। তবে মুহূর্তের অমনোযোগে ২০ রান করে ফেরেন সাদমান। তার উইকেট নিয়ে রাঙ্গানা হেরাথকে (৪৩৩) ছাড়িয়ে টেস্ট ইতিহাসের সফলতম বাঁহাতি বোলার হন মিচেল স্টার্ক (৪৩৪)

তানজিদ ও মুমিনুল এরপর ভুল আর করেননি বললেই চলে। ছাড়ার বল ছেড়েছেন, মারার বল মেরেছেন। তাতে রান যেমন বেড়েছে, তেমনি গড়ে উঠেছে জুটি। টেস্ট ইতিহাসের সফলতম পেস চতুষ্টয় স্টার্কহেইজেলউডকামিন্সলায়নের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে তাদের সামনে। দুজনই ক্রিজের গভীরে গিয়ে খেলেছেন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলের জন্য অপেক্ষা করেছেন। দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা তানজিদ দিন শেষে অপরাজিত ৬৭ বলে ৩২ রানে। মুমিনুল অপরাজিত ৪৯ বলে ৩৫ রানে। এই ইনিংসের পথে তামিম ইকবালকে (৫১৩৪) ছাড়িয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট রানসংগ্রাহকও হয়েছেন মুমিনুল।

দিন শেষে ধারাভাষ্যকার ডেভিড ওয়ার্নার বললেন, ‘বাংলাদেশের দিন, মাথা উঁচু রাখতে পারে তারা।’ উইকেট ও রানের সঙ্গে এই সম্মানও প্রথম দিনে বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি। দ্বিতীয় দিনে সেই সাফল্য ধরে রাখার দিকেই তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশের দর্শকরা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধলালদিয়া কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর ৩০ আগস্ট