২০০৯ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এলাকা সমপ্রসারণ নিয়ে তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর একটি উদ্যোগে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। এ নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ ধরার প্রতিযোগিতাও আমরা দেখেছি। দীর্ঘ দেড় যুগ পর নগর সম্প্রসারণের বাস্তবতাকে আবারো উপলব্ধি করলেন বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। আটারো বছর আগে নগর সম্প্রসারণের যে প্রয়োজনীয়তা তৎকালীন মেয়র উপলব্ধি করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বর্তমান মেয়র ঘোষণা করেছেন শহর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা। এখন এটি চরম বাস্তবতা, যা এড়িয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
চট্টগ্রাম বিশ্বের নগর ও বন্দরের ইতিহাসে একটি পরিচিত নাম। পৃথিবীর প্রাচীন বন্দর–শহরগুলো যেমন সিংহল, মালাক্কা, কালিকট, জাভা, সুমাত্রা, মালয়, ক্যান্টন বন্দরগুলোর নামের পাশে চাটগাঁ (চট্টগ্রাম) নামের খ্যাতি রয়েছে যথেষ্ট। এ বন্দর শুধু জাহাজ বোঝায় মাল উঠানামার সুযোগ সুবিধার জন্য বিখ্যাত ছিল না, বরং এ বন্দর এক সময় পরিণত হয়েছিল গোটা বাংলাদেশের শিক্ষা, সভ্যতার পীঠস্থান, শিল্প–বাণিজ্যের লীলাভূমি। তাছাড়া এ বন্দর ও নগর ছিল আরব, চীন, গ্রীক, রোমান, পর্তুগিজ, ডেনিস ও ইংরেজ সভ্য জাতির পণ্ডিত, সাধক, ধর্মপ্রচারক ও ভূগোলবিদদের পাশাপাশি বণিকদের তীর্থস্থান। ষোল শতকের এক পরিব্রাজক সিজার ফ্রেডরিক চট্টগ্রাম বন্দর অঞ্চলে তৎকালীন পৃথিবীর উন্নত জাহাজ নির্মাণ কাহিনির এক চিত্তাকর্ষিক বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, “এখনকার সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম) জনবহুল এক বিশাল বাণিজ্য কেন্দ্র। এ বন্দরে প্রতিদিন গড়ে দুইশ‘ জাহাজ লবণ বোঝাই হইয়া বিদেশ গমন করে। এখনকার জাহাজ নির্মাণ কৌশল এত সুন্দর ও কাঠ এত মজবুত যে ইস্তাম্বুলের সুলতান আলেকজান্দ্রিয়ার বদলে এখন তার রাজ্যের প্রয়োজনীয় সমস্ত জাহাজ এইখান হইতে তৈয়ার করাইয়া থাকেন।” মূলত এসব কারণে চট্টগ্রাম বন্দর প্রাচীন বন্দর ও নগরসমূহের চেয়ে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ভাগ্যের পরিহাস সুমাত্রা, মালয়, ক্যান্টন, জাভা ও সিংহল তাঁর প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে পৃথিবীর আধুনিক বন্দর ও নগর হিসেবে পরিচর্যা পেলেও চট্টগ্রামের রূপ–লাবণ্য বিকৃত করে চুন–কালি দিয়ে শুধু টু–পাইস কামানোর মকামে পরিণত করা হয়েছে। এ সবের পেছনে কিন্তু রাষ্ট্র থেকে রাজনীতিবিদ সবাই সমানভাবে দায়ি। রাষ্ট্র বারবার চট্টগ্রামের প্রতি বেনিয়া–লুটেরাদের চরিত্র চর্চা করেছে। আর রাজনীতিবিদরা ফারাক্কার ন্যায় ইস্যু করে তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা চারশত বছরের ইতিহাসে বিশাল ও আধুনিক নগরের মর্যাদা পেলেও হাজার বছরের চট্টগ্রাম প্রাচীন নগর হিসেবে সর্বোপরি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বা প্রধান যোগানদাতা হিসেবে যে মর্যাদাটুকু পাওয়ার কথা সে মর্যাদা আগের পরাধীন শাসনামলের কথা বাদ দিলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও পায়নি। তার কারণ অনেক হলেও প্রধান কারণ হিসেবে ধরে নিতে পারি আমাদের সচেতনতার অভাব ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ঐক্যের অভাব। বিনয়ের সাথে অভিযোগ, দেশের কোন শহরে বা মফম্বলে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মত অনৈক্য, প্রতিহিংসা ও পরশ্রীকাতরতা খুব কমই দেখা যায়। আর তাদের অনৈক্য, প্রতিহিংসা, পরশ্রীকাতরতা তাদের রাজনৈতিক কেরিয়ার কতটুকু উন্নত হচ্ছে তা বোধগম্য না হলেও চট্টগ্রাম বিদ্বেষীরা যে মহাখুশি এবং চট্টগ্রামের উন্নয়নে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি হচ্ছে তা বলার অবকাশ নেই। এ লেখাটির পূর্বে চট্টগ্রামের বন্দর ও কর্ণফুলী নদের নির্মম ও অসহায়ত্বের কথা আমি পত্রিকায় অনেকবার লিখেছি। কর্ণফুলীর তৃতীয় সেতুকে আমরা দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীরা আপাততঃ স্বর্গীয় উদ্যানের মতো ভাবছি। এটি আমাদের আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা, নিজেদের কথাই ভাবছি। এ রকম ভাবাও প্রত্যাশা মানুষের থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ঝুলন্ত সেতুর নামে যে পিলার সেতুটি আমাদের জন্য করা হয়েছে তার পরিণতি দেখতে হলে একবার কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে রাঙ্গুনীয়ার কোদালা চা বাগান পর্যন্ত নৌ ভ্রমণ করে আসতে হবে।
এক সময় যে জাহাজ কর্ণফুলী মোহনা হয়ে সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতো, আজ তা গভীর সমুদ্র থেকে মোহনা পর্যন্ত আসতে পারে না। এ নদীতে যে পলি জন্মেছে, তার পরিনাম এতো ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে, ক্রমান্বয়ে কর্ণফুলী নদী ‘সাঁকো’ দিয়ে পারাপার সম্ভব হবে। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা ভোটযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনে দেশ সাহারা মরুভূমি হোক তাতে কী ? যেই নীতিতে তাঁরা রাজনীতি করছেন এই হিসেবে কথাটি বলা। ব্রীজ হয়েছে, যখন কর্ণফুলীতে পানিই থাকবে না তখন ব্রীজ আমাদের কি কাজে আসবে? চট্টগ্রাম বন্দরের তার অস্তিত্বই বা থাকবে কীভাবে। সে যাক, মূল কথায় আসি। চট্টগ্রাম শহর বা সিটি কর্পোরেশনের সমপ্রসারণ ও উন্নয়ন প্রসঙ্গে। উন্নয়নের কথা আগেই বলেছি উন্নয়নের একটি তাত্ত্বিক দিক হচ্ছে যেখানে নগর, শহর ও শিল্পায়ন হবে সেখানে উন্নয়ন ঘটবে। হয়তো তা প্রত্যাশার সিঁড়ি অতিক্রম নাও করতে পারে। তবুও উন্নয়নের জন্য নগরায়ন একটি অপরিহার্য বিষয় আর শাক্তিশালী নগরায়নের জন্য প্রয়োজন সার্বিক উন্নয়ন। সঠিক উন্নয়নের প্রবক্তাদের মতে, ‘একটা সমাজের বিভিন্ন দিকসমূহ পরস্পর এমনই ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত যে, আলাদা–আলাদাভাবে কোনো একটি দিকের উন্নয়ন চূড়ান্ত বিচার সম্ভব নয়। তাই প্রকৃত উন্নয়নের জন্য সার্বিক উন্নয়ন–প্রক্রিয়াই যথার্থ।’ অর্থাৎ শহর উন্নয়নের প্রক্রিয়ার সাথে জনসমষ্টি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিকতার সাথে শহর সম্প্রসারণ উন্নয়নের একটি অংশ। দূর অতীতের ইতিহাস না হয় নাই– বললাম। এই যে সোনারগাঁও‘র ইতিহাসে দেখুন, এখানে যখন বাংলার মোগল সুবাদাররা থাকতেন এটি যখন বাংলার রাজধানী ছিল, তখন তাবৎ বিশ্ব সোনারগাঁও এর দিকে তাকিয়ে দেখতেন। এখানে রাজা–রানিদের প্রাসাদ, হাম্মানখানা, সরাইখানা, রাস্তা–ঘাট এমন কী সমাধিও পর্যটকদের অবাক করে। অথচ সোনারগাঁও যখন রাজা হারা নগরে পরিণত হল, রাজধানী যখন বুড়িগঙ্গার তীরে চলে গেল, সোনারগাঁও ইতিহাসের পাতায় নিঃস্ব ও উপেক্ষিত মফম্বল শহরে পরিণত হলো। নগরের মতো উন্নয়ন তার আর হয় না। এভাবে বাংলার এক সময়কালের রাজধানী রাজমহল, মুর্শিদাবাদ ইতিহাসের স্মৃতির পাতায় প্রসিদ্ধ নগর হিসেবে পরিচিত। আধুনিক ঢাকা এসবকে মফস্বলে পরিণত করেছে। কারণ এসব এলাকা আধুনিক নগর সভ্যতা থেকে অনেক পশ্চাতে। একটি কথা আমাদের বোধে আসতে হবে, আমাদের আবেগ আমাদের প্রকৃতির মতো। আমাদের আবেগ যখন চেতনায় শাণিত হয় তখন উপযুক্ত ও যোগ্য নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। ‘এরপর আমাদের আবেগের জল পাত্রে নিয়ে রাজনীতি হয়েছে মাত্র‘। রাজনীতি মানে যেখানে প্রজাদের মঙ্গল, দেশের উন্নয়ন! সেই রাজনীতি ঠকবাজি, চালবাজি, চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস–জঙ্গীবাদ আর দলবাজির মাধ্যমে ‘ভালো কাজে বাধা অসৎ কাজে সাড়া’ নীতিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে এ চট্টগ্রামকেও। আশার আলো জ্বলেছিল ২০২৪ এ আগস্টে। ছাত্র জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত হলো। তিনি দীর্ঘ ১৯ মাস দেশ শাসনে ছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র হিসেবে তাঁর কাছ থেকে যে প্রত্যাশা ছিল তার ছিটেফোঁটাও তিনি করে দেখাতে পারেন নি। বর্তমান বিএনপি সরকার সেই জায়গায় কিছুটা আশার বাণী শোনাচ্ছে। আমরাও আশাবাদী। তবে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের অনেক সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। জলাবদ্ধতা কমিয়ে আনা, পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমে গতি ফেরা, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণ, স্বাস্থ্যসেবায় নতুন নতুন পদক্ষেপ নগরবাসীকে আশাবাদী করে তুলেছে। এসময় নগর সম্প্রসারণের মত সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে নগরীর উপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে আশা করা যায়।
লেখক: কলামিস্ট। অধ্যক্ষ, অপর্ণাচরণ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।










