স্থানীয় প্রশাসন নির্বাচনে নারী কি ক্ষমতায়িত হবে?

ডেইজী মউদুদ | শনিবার , ৮ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:৩১ পূর্বাহ্ণ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীর অবস্থান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হলেও এখনো বহু সামাজিক ও কাঠামোগত বাধা নারীর ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবেই রয়েছে। আইনি কোটা ব্যবস্থার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও বাস্তব ক্ষেত্রে তারা কোন ক্ষমতা পান না, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার তো প্রশ্নই আসেনা। বিগত ২০২৫ সালে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সুপারিশ করা হয়েছিল। সুপারিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধান নারীকে প্রজাতন্ত্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মূল ধারায় নিয়ে আসার বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছে। সংবিধানের ২৮ () ধারায় বলা হয়েছে “নারীরা রাষ্ট্র ও জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করবে”। ধারা ২৮ () অনুযায়ী “রাষ্ট্র নারীদের, শিশুদের বা সমাজে পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করবে”।কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবে বিদ্যমান সংরক্ষিত নারী আসন পদ্ধতি পরিবর্তন করে পুরো পরিষদের এক তৃতীয়াংশ ওয়ার্ড (একক আসন) ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রতিটি পরিষদে নারী সদস্যরা পদাধিকার বলে চেয়ার ও মেয়র কাউন্সিলের নির্বাহী পরিষদের এক তৃতীয়াংশ সদস্য পদ লাভ করবেন বলে প্রস্তাব করা হয়। স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে এবং প্রতিষ্ঠান সমূহের স্থানীয় কমিটিগুলোতে সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যগণ আনুপাতিক হারে চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

প্রস্তাবে বলা হয়, দক্ষ নারী সদস্যগণ চেয়ারপারসন ও মেয়র, সভাধ্যক্ষ ও ছায়া পরিষদ নেতা ইত্যাদি পদে নির্বাচিত হবার সুযোগ লাভ করতে পারেন। তিনটি পার্বত্য জেলায় স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে বিভিন্ন জাতিসত্তা অধ্যুষিত এলাকায় নারীরা এই সংরক্ষিত নারী আসনের বিশেষ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধ মান বিকাশের সংগে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার জন্য ওয়ার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং সে মোতাবেক নারী সদস্যকে আনুপাতিক কোটায় নির্ধারণ করা হবে বলে স্থানীয় সরকার কমিশনের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সনদ আর সংবিধান সবই ঠিক আছে, কিন্তু কর্মস্থান আর কর্ম পরিবেশে রয়েছে হাজারো প্রতিবন্ধকতা, যার মূলে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। নারী স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।এই প্রতিবন্ধকতার চুম্বক অংশ বিশ্লেষণ করলে বলতে পারি, সামাজিক ও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, সংরক্ষিত আসনের সীমাবদ্ধতা, এবং অপ্রতুল আর্থিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতা। আগেও উল্লেখ করেছি, মূল সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও দৃষ্টিভঙ্গী। সমাজে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নারী নেতৃত্বকে এখনো ঠিক মতো মেনে নেয়া হয় না। পুরুষ সহকর্মীদের অসহযোগিতায় নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। এর মাঝে রয়েছে সংরক্ষিত আসনের বৈষম্য, সরাসরি বা একক নির্বাচনী এলাকার পরিবর্তে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন ও প্রতীকী ক্ষমতার কারণে নারী সদস্যরা অবমূল্যায়িত হয় এবং তাদের নির্দিষ্ট কোনো ওয়ার্ডের পূর্ণ দায়িত্ব থাকে না। অন্যদিকে ক্ষমতা ও বাজেটের অভাব। স্থানীয় সরকারের নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নারীদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। পুরুষ জনপ্রতিনিধির মতো তাদের নিজস্ব কোন বড় বরাদ্দ থাকে না।

এছাড়া সামাজিক ও পরিবারের বাধা আরো অন্যতম অন্তরায়। রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের কারণেই নারীরা রাতে কর্মক্ষেত্রে বা ঘরের বাইরে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। শিক্ষা ও সচেতনতার ঘাটতিও নারীদের ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম অন্তরায়। তবে দেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে। নারী সমাজ আশা করছে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া বর্তমান সরকার শক্তিশালী ও জোরদার করবেন। নারী সংগঠনগুলোও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে শক্তিশালী করতে ব্যাপক সোচ্চার। তারা দেশব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তৃণমূল থেকে শুরু করে সুশীল নারীদের এই বিষয়ে সচেতন করছেন। এবং প্রত্যেকের মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টিকে সরকারের নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দেখা যাক, সত্যিকারের ক্ষমতায়ন আসলেই পেতে যাচ্ছন কি না নারীরা!

পূর্ববর্তী নিবন্ধজুলাই বিপ্লবের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধসবকিছুতেই নিখুঁত হতে হবে-এই চাপ নারীদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?