পটিয়া সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে

সরকারি বরাদ্দ বাড়ল ৭ কোটি টাকা, রেণু ও পোনা উৎপাদন বাড়বে ৩০ ভাগ

শফিউল আজম, পটিয়া | শনিবার , ১ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে থাকার পর এবার বদলে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের একমাত্র পটিয়া সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারটি। ১৯৬৩ সালে ৩.২৬ হেক্টর জমির উপর উপজেলার কচুয়াই ইউপিতে এ খামারটি গড়ে উঠে। প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৬৩ বছরেও সরকারি এ খামারটির হয়নি কাক্সিক্ষত উন্নয়ন। যেন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে চলছিল দক্ষিণ সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি।

তবে দীর্ঘ ৬৩ বছর পর এবার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হতে চলেছে একমাত্র সরকারি এ মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের। খামারের নানাবিধ উন্নয়নে এবার সরকারি বরাদ্দ মিলল প্রায় ৭ কোটি টাকা। ‘বিদ্যমান সরকারি মৎস্য খামারসমুহের সক্ষমতা ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (১ম পর্যায়)’ অধীনে এ খামারটিতে শুরু হয়েছে ৭টি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৮ উপজেলার হাজারো মৎস্য চাষীদের রেণু ও পোনার চাহিদা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন খামার সংশ্লিষ্টরা। এ প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হলে বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতার সাথে বৃদ্ধি পাবে ৩০% উৎপাদন। উল্লেখ্য বৃহত্তর চট্টগ্রামের দুইতৃতীয়াংশ নার্সারীর পটিয়াতে রয়েছে। সে হিসেবে রেণু ও পোনা উৎপাদনে চট্টগ্রাম জেলায় পটিয়ায় প্রথম।

এদিকে গত ২৭ জুলাই মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দীন টুকু আকস্মিক সফরে এসে প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি নির্মাণাধীন সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন এবং ১২টি পুন:খনন করা পুকুর, অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ তদারকি করেন। পরে তিনি একটি পাঙ্গাস মা মাছকে ইনজেকশন দিয়ে রেণু উৎপাদন কাজ উদ্বোধন করেন।

খামারের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২টি পকুর পুন: খনন। ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫শ’ ফুট সীমানা প্রাচীর পুন:নির্মাণ। ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬শ’ ফুট অভ্যন্তরিণ আরসিসি রাস্তা নির্মাণ। ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২২ কেভি শক্তি সম্পন্ন স্যোলার প্যানেল স্থাপন। ১ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই হাজার বর্গফুট লেভার সেড নির্মাণ। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ হাজার ফুট জায়গায় অফিস কাম প্রশিক্ষণ সেন্টার নির্মাণ। ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ইন্টারনেট অফ থিংকস (আইওটি) ব্যাচ বটম লাইনার স্থাপন। যা ৭.৫০০ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন। এ ৭টি উন্নয়ন কার্যক্রম প্রকল্পের অধীনে বর্তমানে চলমান রয়েছে। এসব উন্নয়ন কাজ গত ২৫২৬ অর্থবছরের নভেম্বর মাসে শুরু হয় এবং আগামী বছরের ৩০ জুন এ উন্নয়ন কার্যক্রম শেষ হবে বলে জানা যায়।

মৎস্য অধিদপ্তর পরিচালনাধীন এ সরকারি এ মৎস্য খামারে বর্তমানে বছরে উৎপাদন হয়, কার্প জাতীয় রেণু ও পোনা ৩৫০ কেজি, প্রাকৃতিক উৎসের পোনা ৪৫ হাজারটি, পাঙ্গাসের রেণু ও পোনা ৮৩৪ কেজি, মোনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা ১ লাখ ৭২ হাজারটি। এ খামারটির ৩.২৬ হেক্টও জমির মধ্যে বর্তমানে ১২টি পুকুর রয়েছে। যার জলায়াতন ১.৯ হেক্টর এবং এখানে বর্তমানে পোনা ও রেণু উৎপাদনে রয়েছে হ্যাচারি ৯টি, সার্কুলার ট্যাংক ৮টি, সিস্টার্ন আরসিসি বোতল বড় ৫টি ও ছোট ৪টি। এছাড়াও এখানে মা মাছ (ব্রুড) হালদার জিন মজুদ রয়েছে ৩৫০০ কেজি। তন্মধ্যে রয়েছে রুই, কাতলা, কালি বাইশ ও গনিয়া। চাইনিজ কার্প জাতীয় মাছের মধ্যে রয়েছে বিগ হেড, গ্র্যাস কার্প, সিলভার কার্প ও থাই পাঙ্গাস এবং গিফ্‌ট তেলাপিয়া ১ হাজার কেজি।

খামার সূত্রে জানা যায়, এ খামারে মোট জনবল রয়েছে ৮জন। এরমধ্যে বর্তমানে ৬টি পদেই খালি রয়েছে। বর্তমানে একজন খামার ব্যবস্থাপক ও একজন পাম্প অপারেটর দিয়েই চলছে এ খামার। তবে দৈনন্দিন কাজের যোগান দিতে এখানে মাস্টার রোলে ৩জন শ্রমিক কাজ করেন বলে জানা যায়। খালি থাকা পদগুলো হলো অফিস সহকারী ১জন, ক্ষেত্র সহকারী ১জন, হ্যাচারি সহচর ১জন, ড্রাইভার ১জন, পিয়ন ১জন ও নাইটগার্ড ১জন। পদগুলো খালি থাকায় খামারের উৎপাদনসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান খামার সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, পটিয়ার সরকারি মৎস্য খামারটির নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্য খামার ব্যবস্থাপনা দেশের মৎস্য খাতকে আরও টেকসই ও লাভজনক করে তুলবে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পটিয়া সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার স্বপন চন্দ্র দে জানান, এখানে রেণুপোনার চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে রেণু ও পোনা উৎপাদনে খামারের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এতে চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের অনেক পোনা চাষি উপকৃত হবে। পাশাপাশি গুণগত মান সম্পন্ন রেণু ও পোনার চাহিদা মেটাবে।

এ বিষয়ে পটিয়া সরকারি মৎস্য খামার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবু তৈয়ব বলন, খামারের পুরো উন্নয়ন কাজগুলো শেষ হলে খামারটির একটি দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মৎস্য চাষীদের প্রশিক্ষণসহ রেণু ও পোনা চাষিরা নানাভাবে উপকার ভোগ করবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজুলাইয়ে বেড়েছে ধর্ষণ ও আত্মহত্যা
পরবর্তী নিবন্ধওয়াসার পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ