চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন প্রকাশ ডেভিড ইমনের অর্থ সাম্রাজ্যের ‘ক্যাশম্যান’ ইউসুফকে খুঁজছে পুলিশ। ডেভিডের নেতৃত্বে পরিচালিত চাঁদাবাজ চক্রের অর্থ লেনদেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উঠে এসেছে মোহাম্মদ ইউসুফ নামের এক ব্যক্তির নাম। ডেভিড ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের কাছ থেকে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি, নির্ধারিত বাহকের মাধ্যমে নগদ অর্থ সংগ্রহ এবং পরে হুন্ডি ও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সেই অর্থ ‘জায়গামতো’ পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। এদিকে পুলিশ ইমনকে রিমান্ডে আনার জন্য আদালতে আবেদন করেছে। আগামীকাল রোববার এই রিমান্ডের শুনানি হতে পারে বলে আভাস দিয়ে সূত্র বলেছে, তাকে কমপক্ষে দশ দিনের রিমান্ডে আনার চেষ্টা করা হবে।
পুলিশ বলছে, ইউসুফকে গ্রেপ্তার করা গেলে শুধু একটি চাঁদাবাজ চক্রের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত অর্থ পাচার, সহযোগী নেটওয়ার্ক এবং বিদেশে অবস্থানকারী সন্ত্রাসীদের অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। ইতোমধ্যে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ইমন এবং তার সহযোগীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং একাধিক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, পুরো চাঁদাবাজি কার্যক্রমটি ছিল একটি সুসংগঠিত ‘অপারেশন’। তথ্য সংগ্রহ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদা আদায়, হামলা পরিচালনা এবং অর্থ সরিয়ে নেওয়ার জন্য ছিল পৃথক পৃথক টিম। প্রতিটি সদস্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতেন, যাতে একজন ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকে।
গত বুধবার যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিন সহযোগীসহ ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। তাকে রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, বর্তমানে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী প্রকাশ বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ছিলেন ডেভিড ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। তারা সম্ভাব্য টার্গেট নির্ধারণের আগে ব্যবসায়ীর আয়–ব্যয়, সম্পদের পরিমাণ, নির্মাণাধীন ভবন, ব্যবসার ধরন, বিদেশে থাকা স্বজন, সন্তান কোথায় পড়াশোনা করে, এমনকি পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন চলাফেরার তথ্যও সংগ্রহ করা হতো। এই কাজের জন্য নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে তাদের নিজস্ব বিশাল এবং সুসংগঠিত সোর্স বাহিনী। টার্গেট ঠিক করা হলে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করে ফোন করা হতো। বিশ লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হতো। ভুক্তভোগীকে বোঝানো হতো যে, তার পরিবারের প্রতিটি সদস্য সম্পর্কে চক্রটির কাছে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে গুলি, অপহরণ, হামলা কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের হুমকি দেওয়া হতো। চাঁদা না পেয়ে একাধিক হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা তারা ঘটিয়েছে।
পুলিশ জানায়, চাঁদার টাকা তারা সব সময় নগদে নিত, এক হাজার টাকার নোট। সংশ্লিষ্টদের নির্দিষ্ট স্থানে টাকা পৌঁছে দিতে বলা হতো। কখনো কখনো নিজেদের লোক দিয়েও টাকা কালেকশন করা হতো। সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরের বাসিন্দা, এমন যুবকদের নিয়ে টিম গঠন করে টাকা সংগ্রহের জন্য পাঠানো হতো। নির্দিষ্ট স্থানে অথবা ভুক্তভোগীর বাসা বা প্রতিষ্ঠানের সামনে গিয়ে তারা নগদ অর্থ সংগ্রহ করতেন। এরপর সেই টাকা নগরের জিইসি মোড় এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে ইউসুফের কাছে জমা দেওয়া হতো। ইউসুফ সেখান থেকে হুন্ডি অথবা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ডেভিড ইমনের কাছে পাঠিয়ে দিতেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ বলেন, ডেভিড ইমন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, আইনশৃক্সখলা বাহিনীর নজর এড়াতে তিনি সরাসরি টাকা নিতেন না। তথ্য সংগ্রহ, চাঁদা আদায় এবং হামলা পরিচালনার জন্য আলাদা আলাদা টিম ছিল। যারা টাকা সংগ্রহ করতেন তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্য এলাকা থেকে এসে আবার চলে যেতেন।
জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ইউসুফকে গ্রেপ্তার করা গেলে চাঁদাবাজির টাকার উৎস, গন্তব্য, অর্থ পাচারের কৌশল এবং এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। এজন্য তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আরো তথ্য পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, প্রথমে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। রাজি না হলে বাসা, অফিস কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হতো। পরে বিভিন্নজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে দর কষাকষি করে চাঁদার অংক নির্ধারণ করা হতো। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ইমন কখনো বিশ লাখ টাকার নিচে চাঁদা দাবি করতেন না। দর কষাকষি করে পাঁচ লাখের উপরের অংকে সমঝোতা করতেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হলেও তার অর্থের নেটওয়ার্ক এখনো অক্ষত। বিশেষ করে মোহাম্মদ ইউসুফকে গ্রেপ্তার করা গেলে চাঁদাবাজির অর্থ কোথা থেকে কোথায় গেছে, কারা এর সুবিধাভোগী এবং বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে কীভাবে অর্থের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে–এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটিত হতে পারে। পুলিশ ইমনের অস্ত্রশস্ত্রের সন্ধানের পাশাপাশি অর্থ সাম্রাজ্যের খোঁজ করতে ইমনের ক্যাশম্যান ইউসুফকে খুঁজছে।












