দুর্ঘটনার পর মৃত সন্তান প্রসব, আইসিইউতে পোশাক শ্রমিক মা

আনোয়ারার বাস দুর্ঘটনা নিহত দুই নারীর পরিবারে শোকের মাতম

আনোয়ারা প্রতিনিধি | শনিবার , ১ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

আনোয়ারার চাতরি চৌমুহনী বাজার গোলচত্বরে শ্রমিকবাহী বাস দুর্ঘটনায় আহত টেক্সিযাত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা পোশাক শ্রমিক কাউসার আক্তার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত এক পুত্রসন্তান প্রসব করেছেন। এরপর থেকে তিনি আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এছাড়া, এ ঘটনায় নিহত হন টেক্সির যাত্রী কলি দত্ত ও ইফা শীল। পোশাক শ্রমিক মা কলি দত্তকে হারিয়ে তার ১৫ বছরের ছেলে বিজয় দত্তের আহাজারি হৃদয়বিদারক দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে।

জানা যায়, বেপরোয়া গতির একটি বাস টেক্সিকে চাপা দেওয়ার পর দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অন্তঃসত্ত্বা কাউসার আক্তারকে চমেক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গতকাল ভোরে তিনি সাত মাসের মৃত এক পুত্রসন্তান প্রসব করেন। নবজাতককে দুপুরে উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরি গ্রামে দাফন করা হয়। সন্তানকে মাটির নিচে শুইয়ে রেখেই হাসপাতালে ফিরে যান স্বজনরা। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন কাউসারের স্বামী আরিফ; চোখের জল ছাড়া মুখে কোনো কথা ছিল না।

পরিবার জানায়, প্রায় আট বছর ধরে কেইপিজেডের একটি কারখানায় কাজ করেন কাউসার। তাদের সংসারে রাফি (১০) ও তাবাসসুম () নামে দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। মায়ের সংকটাপন্ন অবস্থায় শিশু দুটি দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ছোট মেয়ে তাবাসসুম বারবার মাকে খুঁজে কাঁদছে।

কাউসারের শ্বশুর নুরুন্নবী বলেন, দুর্ঘটনায় আমার পুত্রবধূর মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। পেটের সন্তানটাকেও বাঁচানো গেল না। আমার ছেলে আরিফ শোকে পাথর হয়ে গেছে। এখন আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে কয়েকজন এখনো আশঙ্কামুক্ত নন। এর আগে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতেই হাসপাতালে ছুটে যায় নিহত কলি দত্তের ছেল বিজয়। জরুরি বিভাগের সামনে মায়ের নিথর দেহ দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারেনি সে। হাসপাতালের করিডোরের এক কোণে বসে বারবার ‘মামা…’ বলে তার বুকফাটা কান্নায় উপস্থিত মানুষের চোখও ভিজে ওঠে। চিৎকার করে বিজয় বলতে থাকে, আমার মা তো অফিস শেষে বাসায় ফেরার কথা ছিল। আমি অপেক্ষা করছিলাম। মা কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল? আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব? আপনারা আমার মাকে এনে দিন। আমি মা ছাড়া বাঁচব না।’

কিছুটা শান্ত হওয়ার পর বিজয় জানায়, প্রতিদিন সকালে মা পরিবারের সবার জন্য রান্না করে কাজে যেতেন। রাতে ফিরে আবার রান্না করতেন, দুই ছেলের সব আবদার পূরণ করতেন, নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতেন। মা ছাড়া আমি একটি মুহূর্তও ভাবতে পারি নাকান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে সে।

জানা গেছে, বিজয় বারখাইন ঝি.বা.শি. উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছোট। বড় ভাই সৈকত দত্ত (১৯) দারিদ্র্যের কারণে কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। বাবা কাজল দত্ত একজন প্রান্তিক কৃষক। অভাবের সংসারের মূল ভরসা ছিলেন কেইপিজেডে কর্মরত কলি দত্ত। প্রায় সাতআট বছর ধরে তার উপার্জনেই চলত পুরো পরিবার।

স্ত্রীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন কাজল দত্ত। তিনি বলেন, আমার স্ত্রীকে হারিয়ে পুরো সংসার অন্ধকার হয়ে গেছে। আমাদের সব স্বপ্ন ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। জানি না এখন কীভাবে সংসার চলবে।

এদিকে, আনোয়ারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জুয়েল মিয়া বলেন, ঘাতক বাসটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক ও তার সহকারী দুর্ঘটনার পরপরই পালিয়ে গেছেন। স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করা হয়েছে। পলাতকদের গ্রেপ্তার এবং বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোরিয়ান ইপিজেডের (কেইপিজেড) উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকবাহী বাসের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রতিষ্ঠান গভীরভাবে শোকাহত। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স ও সার্ভিস ইন্স্যুরেন্সের সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থীকে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলালের শিক্ষা সহায়তা
পরবর্তী নিবন্ধভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন না শেখ হাসিনা