চট্টগ্রামজুড়ে কয়েকবছর ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারী সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে অবশেষে কারাগারে যেতে হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় নাম–পরিচয় লুকিয়ে ‘মিরাজ’ সেজে বাঁচার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সায়মা আফরিন হিমার আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। যশোর জেলার সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার পরবর্তী ডেভিডের দেখানো মতে ফটিকছড়ি থেকে ‘সন্ত্রাসী কর্মে ব্যবহৃত’ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। উক্ত ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাতেই মূলত তিনি কারাগারে গিয়েছেন।
এর আগে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এসময় আগের একটি অস্ত্র মামলা ও একটি হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার দেখানোর (শোন অ্যারেস্ট) জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে একই আদালতে পৃথক দুটি আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে বিচারক আবেদনগুলো মঞ্জুর করেন।
আদালতে থাকা চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কোর্ট ইন্সপেক্টর হাবিবুর রহমান গতকাল সন্ধায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত আবেদনের কপি আদালত পর্যন্ত আসেনি। আজকের (গতকাল) মধ্যে আবেদন চলে আসবে। আগামী রোববার অথবা সোমবার সে বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি ফটিকছড়ি থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলামূলে গত ২৬ জুলাই চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা বরাবর অধিযাচন পত্র (রিকুইজিশন) পাঠায় ফটিকছড়ি থানা পুলিশ। সেখান থেকে পত্রটি হাতে পেয়ে অভিযান চালিয়ে গত ২৯ জুলাই যশোরের কোতোয়ালী থানাধীন সীমান্তবর্তী ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে যশোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম। এসময় তার ৩ সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন– মো. শামীম, মো. শাফায়েত হোসেন ও আল ইসলাম আলিফ প্রকাশ তমাল। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা হলে তাদেরকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। এসময় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ একটি বিদেশি অস্ত্র ও ২টি এলজি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় এ চারজনসহ মোট ৫ জনের বিরুদ্ধে ফটিকছড়ি থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা দায়ের করেন চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরদর্শক (এসআই) মো. জাহিদুল ইসলাম। অপর আসামির নাম হচ্ছে– মো. মিঠু প্রকাশ ধামা ইলিয়াছ। যশোরেরর সীমান্ত এলাকায় সহযোগীসহ ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তার হওয়া নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর দুই নম্বর গেইট এলাকায় জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। তিনি জানান, সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন প্রকাশ ডেভিড ইমন যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহার করতেন বিদেশি সিম ও মোবাইল ফোনের বিশেষ অ্যাপ। তার কাছে পাওয়া গেছে ভারতীয় আধার কার্ডও। তিনি বলেন, ‘গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় আলোচিত যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং প্রত্যক্ষ–পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করা হয়। ২২ জুলাই মাসুদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত অন্যতম আসামি রাউজানের মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াসকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে আমরা অনেক তথ্য পাই। তাদের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে পারি।’ তিনি বলেন, সমপ্রতি ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের মালিককে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও ভাঙচুরের ঘটনা বিষয়েও ধামা ইলিয়াসের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পায় পুলিশ। আর এসব তথ্যই ‘সন্ত্রাসী’ ইমনকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে সহায়তা করেছে। পুলিশ সুপার বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা নেটওয়ার্কের বাইরে অবস্থান করেন। সিম ব্যবহার করেন না। বিদেশি নম্বর, অ্যাপসের মাধ্যমে কথা বলেন। ডেভিড ইমনও সেটা করতেন। তিনি যখন দেখলেন তার ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে, তখন তিনি বিদেশে থাকা গ্যাং লিডার সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাজ্জাদের পরামর্শে ইমন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন বলে আমরা জানতে পারি। ইমন ভারতের আধার কার্ডও করিয়েছেন। সেখানে তার নাম আজহার খান।’ অবস্থান জানতে পেরে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার সময় দাউদকান্দি এলাকায় ইমনকে আটক করার চেষ্টা করে পুলিশ, তবে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এসপি মাসুদ আলম বলেন, ‘আমরা তখন সফল হতে পারিনি। এরপর ঢাকায় তারা গাড়ি বদল করেন, এমনকি তাদের গাড়িচালক পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আসে ইমন খুলনার দিকে যাবেন। আমরা পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় চেকপোস্ট স্থাপন করি। মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সহায়তা করে। কিন্তু আমাদের ব্যাড লাক, আমরা ওই সময়ও তাকে ধরতে পারিনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা জানি যে তিনি খুলনায় যাবেন। খুলনা জেলা পুলিশের সহায়তায় রূপসার দিকেও আমরা একটা চেকপোস্টের ব্যবস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু তারা বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। হঠাৎ গোপালগঞ্জ থেকে নড়াইলের দিকে চলে যান। তখন রাত প্রায় সাড়ে তিনটার মতো বাজে। পরে নড়াইল থেকেও চলে যান তারা। শেষে ভোর পাঁচটার দিকে যশোর পুলিশের সহায়তায় ঝুমঝুমপুর এলাকায় আমরা ডেভিড ইমন ও তার আরও তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই।’ এসময় ডেভিড ইমন নিজেকে মিরাজ নামে পরিচয় দেন। বলেন, তার বাড়ি ঢাকায়। যে গোঁফের কারণে তিনি অধিক পরিচিতি পেয়েছিলেন সেই গোঁফ কেটে বদলে ফেলেছিলেন চেহারা। তবে কণ্ঠে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক টোন ফুটে উঠায় ধরা পড়ে যান তিনি। ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি প্রচার হয়ে যাওয়ায় অপারেশনের পরবর্তী কার্যক্রমগুলো কঠিন হয়ে গিয়েছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি জানিয়ে মাসুদ আলম জানান, যখন ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার অভিযান চলছিল, ঠিক একই সময়ে চট্টগ্রামের আরেক কুখ্যাত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানকে ধরতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আমাদের আরেকটি টিম অবস্থান করছিল। টিভি স্ক্রলে যখন আসে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার’, তখন আমাদের ওই টিম দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।’ পালিয়ে গেলেও রায়হান দোজখ দেখে ফেলেছেন বলেও জানান এসপি মাসুদ আলম। তিনি জানান, ‘ডেভিড ইমনের ঝিকরগাছা হয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। কে সীমান্ত পার করবেন এবং ভারতে কে রিসিভ করবেন, সব ঠিক করা ছিল। এমনকি তার কাছে আধার কার্ড পাওয়া গেছে, যেটা ভারতে ব্যবহার করার কথা ছিল।’ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় হওয়া মামলায় ইমনের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে বলেও জানান তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে এসপি বলেন, এখন পর্যন্ত ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক গডফাদারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কিছুটা কম থাকার সুযোগে তারা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করেনে। চট্টগ্রামে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার শেখ মো. সেলিম, সিরাজুল ইসলাম, জুনায়েদ কাওসার, মো. রাসেল ও কাজী মো. তারেক আজিজ।
গরীব ঘরের ছেলে মোবারক হোসেন ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি একদিন বনে গেলেন ডেভিড ইমন। খুন, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ তিনি নগরীর পাশাপাশি চট্টগ্রামের উত্তর জেলা জনপদে ছড়িয়েছেন। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় নাম আসে মোবারক হোসেন ইমনের। তার বিরুদ্ধে সাতটি খুনসহ মোট ১৩ টি মামলা থাকার তথ্য দিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেন। অস্ত্র ব্যবহারে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল বলে পুলিশের দাবি। পুলিশের সূত্র জানায়, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই জনের একজন ডেভিড ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে দেশে সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান দলটির নেতৃত্বে আসেন। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শ্যুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়েই নগরীসহ জেলার উত্তরের উপজেলাগুলোর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন। মামলার নথি ঘেটে দেখা যায়, ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার মৃত মুছার ছেলে ডেভিড ইমন। কোর্ট ইন্সপেক্টর হাবিবুর রহমান জানান, ডেভিড ইমনের মতো তার সাথে গ্রেপ্তার হওয়া তিন সহযোগীকেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।












