সত্তরের দশকের কথাশিল্পী বিপ্লব দাশের একমাত্র উপন্যাস কিম্পুরুষ। কিম্পুরুষ অর্থ ‘কম পুরুষ’। হিজড়া সমপ্রদায়কে কেন্দ্র করে লেখা বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস এটি।
বিপ্লব দাশ মূলত কবিতা আর ছোটগল্পই লিখেছেন। নাচও আয়ত্ত করেছিলেন। চাকরি করলেও কোথাও থিতু হননি। বোহেমিয়ান জীবনযাপনেই যেন বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন। বইয়ের শুরুতে তাঁকে নিয়ে যতটুকু জানতে পেরেছি, তাতে বেশ ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের মানুষই মনে হয়েছে। সকলের অনুপ্রেরণায় যখন উপন্যাস লিখতে বসলেন, চেয়েছিলেন এমন একটা বিষয় নিয়ে লিখবেন, যা নিয়ে আগে তেমন কাজ হয়নি। সেখান থেকেই হিজড়াদের নিয়ে এই উপন্যাস। যদিও উপন্যাসটি সহজে ছাপানো সম্ভব হয়নি। অশ্লীলতার অভিযোগে প্রায় কেউই ছাপাতে চাইছিলেন না। একজন সম্পাদক তো বলেই বসেছিলেন, “বিপ্লবদা, সত্যিকারের নারী–পুরুষের কথা লিখুন। হিজড়েরা কি মানুষ নাকি?”
এই কথায় লেখক এতটাই কষ্ট পেয়েছিলেন যে এরপর আর কাউকে পাণ্ডুলিপি দেননি। পরে যে পত্রিকায় তিনি চাকরি নেন, সেখানকার ঈদ সংখ্যায় মোস্তফা জব্বারের জোরাজুরিতে পাণ্ডুলিপি দেন। মোস্তফা জব্বার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ঈদ সংখ্যাতেই উপন্যাসটি ছাপাবেন। তবে কম্পোজ করতে গিয়েও ঝামেলা হলো। কম্পোজিটর সাহেব কিছুতেই কাজ করবেন না। কারণ ভাষা এত অশ্লীল যে রোজা রেখে এই উপন্যাসের কাজ করলে রোজা হবে না! পরে মোস্তফা জব্বার তাঁকে রাজি করান। এরপর তিনি ইফতারের পর উপন্যাসটির কম্পোজের কাজ করেন। লেখকও উপন্যাসটি প্রকাশের পুরো কৃতিত্ব মোস্তফা জব্বারকেই দিয়েছেন।
বাংলা সাহিত্যে তখনকার সময়ে এমন ট্যাবু একটা বিষয় নিয়ে কীভাবে কাজ হলো, আর প্রকাশের পথটা কতটা কঠিন ছিল পুরো ঘটনাটাই আমার বেশ গুরুত্বপূর্ণ লেগেছে তৎকালীন সমাজে মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে।
এবার উপন্যাসে ফিরি।
উপন্যাসের শুরু প্রসূতি বিমলার আঁতুড়ঘর থেকে। এর আগেও বিমলার সন্তান হয়েছে। প্রথম সন্তানকে মুখে লবণ দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল হিজড়া হওয়ার অপরাধে। এরপর আরও দু’বার সন্তান হয়েছে, তারাও হিজড়া। বিমলার স্বামী টাকার বিনিময়ে হিজড়া সমপ্রদায়ের প্রধান মমতাজের হাতে সন্তান দুটিকে তুলে দিয়েছে। এবারও খবর পাঠানো হয়েছে। সন্তান যদি আবারও হিজড়া হয়, তাহলে মমতাজ আর গয়না তাকে নিয়ে যাবে। আর স্বাভাবিক ছেলে বা মেয়ে হলে শুধু আশীর্বাদ করে চলে যাবে।
এরপর মমতাজের আকস্মিক মৃত্যুর পর গল্প ফিরে যায় হিজড়া গয়না আর মমতাজের অতীতে। মমতাজদের নাচের দল আছে, সেখানে হিজড়ারাই নাচে। গয়নাও সেই দলের সদস্য। হিজড়াদের দালাল সদয় আবার গয়নাকে ভালোবাসে। কিন্তু এই ভালোবাসার মাঝেও দেখি, গয়নার মানসিক বিপর্যয়ের সময়েও সদয়ের শরীরী চাওয়া আছে। আবার গয়নার ইচ্ছা–অনিচ্ছার মূল্যও সে দেয়। এই দ্বৈততার কারণেই চরিত্রটা আরো বাস্তব লেগেছে।
এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধেরও অল্পবিস্তর ছোঁয়া আছে। সদয়ের বোন একজন বীরাঙ্গনা। কিন্তু তাঁকে নিয়েও গয়না আর সদয়ের প্রতিবেশীদের মুখরোচক গল্পের শেষ নেই। এতে আবারও বোঝা যায়, এত নির্যাতনের পরও বীরাঙ্গনাদের জীবন মানুষের কাছে মুখরোচক গল্পের বিষয়বস্তুই থেকে গেছে। পুনরায় এও মনে হলো, এই দেশে যত ঝড়ই আসুক, মানুষের স্বভাব–চরিত্র বোধহয় বদলায় না, বদলাবেও না। অন্যের ট্র্যাজেডিও এদের কাছে গল্প। সহমর্মিতা জিনিসটা খুবই দুর্লভ এদেশের মানুষের মাঝে। যাই হোক!
মমতাজের গল্পে ব্রিটিশ শাসনামলেরও কিছুটা ছোঁয়া আছে। হিন্দু পুরাণে বৃহন্নলাদের উল্লেখ থাকলেও বাস্তব জীবনে মানুষ তাদের ধর্ম থেকেও বিতাড়িত করতে চায়। জানি না, ছোটবেলা থেকে এত অবহেলা আর নিগ্রহের মধ্যে বড় হওয়ার কারণেই কি না, পরে কেউ ভালো ব্যবহার করলেও তারা এত ডিফেন্সিভ হয়ে যায়।
বইটি ছোট, এক বসাতেই শেষ করে ফেলার মতো। খিস্তিখেউড়ও আছে যথেষ্ট। তবে হিজড়েদের জীবনাচরণ, দুঃখ–দুর্দশা আর সমাজের চোখে তাদের অবস্থান এসব লেখক স্বল্প পরিসরেই বেশ ভালোভাবে তুলে ধরেছেন।
লেখকের ছোটগল্পগুলো অনেক আগে থেকেই আমার উইশলিস্টে আছে। কিম্পুরুষ পড়ার পর আগ্রহটা আরও বেড়ে গেল। অন্তত দ্রুত সংগ্রহের চেষ্টা করব কারণ এই বইগুলোর বিলুপ্তি দ্রুতই ঘটবে। এই উপন্যাসও কিছুদিন পর পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ! বেশিদিন হয়নি কিনেছি। বইয়ের শেষপাতা তেলাপোকার পুরো সংসারের ভয়াবহ চিহ্নযুক্ত। জানি না প্রকাশক কোন গুদামঘর থেকে বইটা বের করে দিয়েছিলেন। যাই হোক, বাংলা সাহিত্যের এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সংগ্রহ এবং পড়ে ফেলার আনন্দটা অন্যরকম।











