
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসরের পর্দা নামছে আজ। ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী মহাযুদ্ধে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেন। আজ রোববার দিবাগত রাত ১টায় অনুষ্ঠিত হবে ২৩তম আসরের চূড়ান্ত পর্ব–ফাইনাল। দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং স্পেন এতে অংশ নেবে। আর্জেন্টিনা ২০২২ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল। কাতারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বকাপের সর্বশেষ এই আসরটি। এর আগে ১৯৭৮ সালে ড্যানিয়েল প্যাসারেলার অধিনায়কত্বে এবং ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে স্পেন ২০১০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় করে। লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে। অন্যদিকে ২০১০ সালে প্রথমবার শিরোপা জেতা স্পেন তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্বপ্নে বিভোর রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে (নিউ ইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়াম) অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল খেলাটি। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার ট্রফি ধরে রাখার লক্ষ্যে এবং লামিনে ইয়ামালের স্পেন তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের খোঁজে মাঠে নামবে। প্রধান রেফারি থাকবেন স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনচিচ। খেলায় হাফ টাইম শোতে থাকছে শাকিরা ও ম্যাডোনার বিশেষ পারফরম্যান্স।
কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে শৃঙ্খলা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং নিখুঁত পাসিং ফুটবলের প্রদর্শন করেছে। তাদের খেলার মূল শক্তি বলের দখল রাখা এবং দ্রুত কাউন্টার–প্রেসিং করা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার লড়াকু মানসিকতা তাদেরকে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে এনেছে। লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা ফাইনাল পর্যন্ত এসেছে চরম নাটকীয়তা ও লড়াকু প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে। মাঝমাঠে রদ্রিগো দে পল ও এনজো ফার্নান্দেসের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সামনে লিওনেল মেসির একক জাদুকরী দক্ষতার ওপর ভরসা করে তারা খেলছে। মাঠে মূল শক্তির লড়াইয়ে স্পেনের সুশৃঙ্খল দলগত প্রচেষ্টা বনাম আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত ব্যক্তিগত প্রতিভা ও হার না মানা মানসিকতার এক ধ্রুপদী লড়াই হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাঠে নজরে থাকবেন যারা তাদের মধ্যে প্রথম নাম আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। নিজের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে আরেকটি রূপকথার সমাপ্তি টানতে মরিয়া এই মহাতারকা। স্প্যানিশ আক্রমণভাগের তরুণ বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল পুরো টুর্নামেন্টেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ত্রাস সৃষ্টি করেছেন। নজর থাকবে তার প্রতিও। শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে লাউতারো মার্তিনেসের দক্ষতা আর্জেন্টিনার অন্যতম ভরসা। স্পেনের মাঝমাঠ টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী রক্ষণ ও মাঝমাঠের সমন্বয় নিয়ে গঠিত। স্পেন দলগতভাবে সম্পূর্ণ ফুটবল খেলছে।
বিশ্বকাপে এর আগে মাত্র একবারই এই দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল, ১৯৬৬ সালের সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২–১ ব্যবধানে জিতেছিল। সর্বশেষ সাক্ষাতে ২০১৮ সালের এক আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে স্পেন আক্রোশমূলকভাবে আর্জেন্টিনাকে ৬–১ ব্যবধানে পরাজিত করেছিল, যা আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ধাক্কা। আর্জেন্টিনার এটি ৭ম বিশ্বকাপ ফাইনাল। তারা ৩ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অন্যদিকে স্পেনের এটি মাত্র ২য় ফাইনাল। ২০১০ সালে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। স্পোর্টস অ্যানালিটিক্স ও সুপার কম্পিউটারের মতে, নির্ধারিত সময়ের জয়ের ক্ষেত্রে স্পেনকে ফেভারিট ধরা হচ্ছে এবং আর্জেন্টিনা আন্ডারডগ হিসেবে মাঠে নামছে। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, স্পেনের শক্তিশালী মাঝমাঠ ও নিয়ন্ত্রণ ম্যাচটি ২–১ বা ৩–১ ব্যবধানে স্পেনের পক্ষে নিয়ে যেতে পারে, তবে আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন মানসিকতা এবং মেসির অবিশ্বাস্য জাদু যেকোনো মুহূর্তেই সমীকরণ বদলে দিতে সক্ষম।
কোচ লিওনেল স্কালোনির দলকে তাদের শিরোপা ধরে রাখার পথে খুব কঠিন সময় পার করতে হয়েছে, বিশেষ করে নকআউট পর্বের পর থেকে, যেখানে অতিরিক্ত সময় বা ইনজুরি টাইমে কষ্টার্জিত জয় পেয়েছে তারা। দক্ষিণ আমেরিকান দলটির খেলার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তিনি শুধু গোল ও অ্যাসিস্টই করেন না, বরং আটবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী নৈতিক সমর্থনেরও এক দৃঢ় উৎস, যিনি পুরো আর্জেন্টিনা দলকে তাদের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলো কাটিয়ে ফাইনাল ম্যাচে পৌঁছাতে সাহায্য করেন। তবে ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন একটি সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ, যে দলটিকে বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন। স্প্যানিশ জাতীয় দলের শুধু একটি সুষম স্কোয়াডই নেই, বরং তারা একটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশলগত পদ্ধতিও অনুসরণ করে। তাদের সক্রিয় বল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষের ওপর ক্রমাগত চাপ তাদেরকে টুর্নামেন্টের সেরা রক্ষণভাগের দলে পরিণত করেছে (মাত্র ১ গোল হজম করে), পাশাপাশি তাদের আক্রমণভাগও অপ্রতিরোধ্য। জয়ের লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্প্যানিশ জাতীয় দল ৪–২–৩–১ ফর্মেশনে খেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ফর্মেশনে থাকবে গোলরক্ষক সিমন; পোরো, কুবারসি, লাপোর্তে ও কুকুয়েরাকে নিয়ে গড়া রক্ষণভাগ; রুইজ ও রদ্রির সমন্বয়ে গঠিত মাঝমাঠের জুটি এবং ইয়ামাল, ওলমো, উইলিয়ামস ও স্ট্রাইকার ওয়ায়ারজাবালকে নিয়ে গঠিত আক্রমণভাগ। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সম্ভবত ৪–১–৩–২ ফর্মেশনে মাঠে নামবে, যেখানে থাকবেন গোলরক্ষক ই. মার্টিনেজ; রক্ষণভাগে মলিনা, রোমেরো, এল. মার্টিনেজ, তাগলিয়াফিকো; রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার পারেদেস; মাঝমাঠে থাকবেন ডি পল, ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার; এবং আক্রমণভাগের জুটি মেসি ও লাউতারো।
চাপ নিয়ে ভাবেন না মেসি : বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে তারার মেলা বসেছিল এক অনুষ্ঠানে। সেখানে মেসিদের সাথে ছিলেন টেনিস তারকা নোভাক জোকোভিচও। সার্বিয়ান তারকার প্রশ্নের উত্তরে লিওনেল মেসি শোনান তার বেড়ে ওঠার গল্প। আওড়ালেন উন্মুক্ত বিহঙ্গের মতো মনের আনন্দে ফুটবল খেলার দিনগুলোর স্মৃতি। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালকে সামনে রেখে তিনি বলেন, চাপ অনুভব না করার কথাও। ফাইনাল সামনে রেখে এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা শোনান তার শুরুর দিনগুলোর গল্প। ‘আমরা অনেক আবেগ নিয়ে ফুটবল খেলে বেড়ে উঠেছি। যেখানেই থাকতাম না কেন খেলতে, মজা এবং আনন্দ করতে চাইতাম। সেটা স্কুলে হোক, রাস্তায় হোক বা কোনো দলের হয়ে খেলার সময় হোক। কারণ আমরা সবাই পাড়ার দল থেকে ফুটবল খেলা শুরু করেছিলাম।’
ফাইনালের ফল ঝুঁকতে পারে যেকোনো দিকে। তবে মেসি বললেন চাপমুক্ত হয়ে খেলতে নামবেন তারা। আমি মনে করি, আমরা কখনই চাপ নিয়ে ভাবি না। আমরা ফুটবলটাকে সহজাত একটা খেলা এবং ভালো সময় কাটানোর উপলক্ষ হিসেবে নিই। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি দল, আমরা জিততে চাই; কিন্তু এটা একটা দলীয় খেলা, প্রতিপক্ষরাও খেলবে এবং আপনি সবসময় জয়ী হতে পারবেন না। ছোট বেলা থেকে আমি শিখেছি, জেতার চেয়ে হারতে হয় বেশি এবং এটাই আমাদের একজন মানুষ এবং খেলোয়াড় হিসেবে বিকশিত করেছে।
যা বললেন স্পেন অধিনায়ক রদ্রি : স্পেন অধিনায়ক রদ্রি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি শারীরিক লড়াই হবে বলে মনে করছেন এবং সম্ভাব্য উস্কানিকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করবেন। ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই মিডফিল্ডার বলেন, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের জন্য এই ফাইনাল হবে আগের যেকোনো ম্যাচের চেয়ে ভিন্ন।
ম্যানচেস্টার সিটির এই তারকা খেলোয়াড় সাংবাদিকদের বলেন, আমার মনে হয়, রোববারের ম্যাচটি একেবারেই আলাদা হবে। এটি হবে অনেক বেশি শারীরিক লড়াইয়ের ম্যাচ এবং আমাদের সেই অনুযায়ী প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে আমাদের জাতীয় দল একটি বিষয়ের জন্য পরিচিত, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারি। রক্ষণ, পাল্টা আক্রমণ কিংবা আক্রমণাত্মক ফুটবল, সব ধরনের খেলাই আমরা খেলতে পারি। আমরা খুবই পরিপূর্ণ একটি দল, আর সে কারণেই আমরা এখানে।’
আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষকে উসকে দেওয়ার কৌশল নিতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রদ্রি বলেন, আচ্ছা, এটাও তো ফুটবলেরই একটি অংশ।












