ডিজিটাল বিপ্লবের এই ঝড়ো হাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক কিছুই। সেই তালিকায় সবার উপরে হয়তো টাইপরাইটার। কিন্তু চট্টগ্রামের আদালত পাড়ায় গেলে এখনো কানে আসে সেই চিরচেনা খটখট শব্দ। আর সেই পুরনো এক টাইপরাইটার যন্ত্রের পেছনে গত তিন দশক ধরে অবিচল বসে আছেন সুনিল বরণ দে।
১৯৯৬ সাল। সময়টা তখন আজকের মতো ডিজিটাল ছিল না। আদালত পাড়ায় মামলার নথিপত্র তৈরির জন্য টাইপরাইটারই ছিল একমাত্র ভরসা। সেই সময়ে জীবিকার সন্ধানে টাইপরাইটারের কি–বোর্ডে আঙুল রাখা শুরু করেন সুনিল বরণ দে। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ২৯টি বছর। যুগ বদলেছে, প্রযুক্তির দাপটে টাইপরাইটার জায়গা হারিয়েছে কম্পিউটার, প্রিন্টারের কাছে। কিন্তু সুনিল বরণ দে’র অভ্যাস বদলায়নি। ছেলে–মেয়েদের বড় করা, তাদের লেখাপড়া, খাতা, কলম, বইসহ যাবতীয় সামগ্রীর খরচ চলে এসেছে এই টাইপরাইটারের আয় থেকেই। সুনিল বরণ দে’র বাড়ি পটিয়ার ধলঘাট এলাকায়। দুই ছেলের একজন কানাডায় থাকেন। অপরজন পটিয়ার আব্দুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
সুনিল বরণ দে জানালেন, পেশাটা আর আগের মতো নেই। কখনো দু–চারটা কাজ মেলে, আবার কখনো সারাদিন বসে থেকে এক পয়সার মুখও দেখা হয় না। এমন অবস্থায় বয়সের ভারে ন্যুব্জ সুনিল বরণ দে’কে এখন তাই পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই বলেন, ‘তোমাকে আর কোর্টে যেতে হবে না। বাড়িতে বিশ্রাম নাও।’ কিন্তু সন্তানদের পক্ষ থেকে এই মমতামাখা অনুরোধ তার কানে পৌঁছালেও হৃদয়ে লাগে না। তিনি প্রতিদিন ভোরে উঠে তৈরি হয়ে চলে আসেন আদালত পাড়ার সেই জরাজীর্ণ বেঞ্চটাতে। কেন এই বয়সে এসেও এমন কষ্ট করা? তার উত্তরটি যেন এক দার্শনিক উপলব্ধি, ‘কোর্টে আসা বন্ধ করলে আমি মরেই যাব।’
তার কাছে এটি শুধু পেশা নয়, অস্তিত্বের অংশ। যে টেবিল, যে টাইপরাইটার গত ২৯ বছর ধরে তার জীবনের সঙ্গী, তার সঙ্গ ছাড়া তিনি নিজেকে কল্পনা করতে পারেন না। আদালতের এই ভিড়, পাশের সহকর্মীর খবরের কাগজ পড়ার শব্দ আর নিজের টাইপরাইটারের ছন্দময় আওয়াজ– এই সব মিলিয়েই সুনিল বরণ দে’র পৃথিবী।
সুনিল বরণ দে’রা হয়তো আধুনিক পৃথিবীর হিসাব–নিকাশে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। কিন্তু তাদের এই অদম্য জেদ, কাজের প্রতি ভালোবাসা আর পুরনো ঐতিহ্যের প্রতি টান আমাদের মনে করিয়ে দেয়– যন্ত্র বদলালেও মানুষের আবেগ বদলায় না। দিনশেষে, সুনিল বরণ দে শুধু একজন টাইপিস্ট নন, তিনিসহ তার সহকর্মীরা চট্টগ্রাম আদালত পাড়ার এক জীবন্ত ইতিহাস। যতদিন তাদের হাতের আঙুল টাইপরাইটারে পড়বে, ততদিন খটখট শব্দের এই সুর বেজেই যাবে। হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যখন সব টাইপরাইটার জাদুঘরে ঠাঁই নেবে।
নগরীর আদালত পাড়ার পুরনো এনেঙ ভবনের (বর্তমানে নারী শিশু বিল্ডিং নামে পরিচিত) দেয়াল ঘেষে বসেন সুনিল বরণ দে’সহ চারজন টাইপিস্ট। আদালত পাড়ার আরো দু–এক জায়গায় বসেন আরো দশ–বারোজন। তারা সকলেই ৮০’র দশক থেকে ৯০ এর দশকে আদালত পাড়ায় জীবিকার সন্ধানে আসেন। এক টাইপিস্ট জানিয়েছেন, এ পেশায় নতুন কেউ আসছেন না। আমরা চলে গেলে এ পেশা হারিয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, এক সময় আমাদের সমিতি ছিল। অনেক সদস্য ছিল। একসময় সদস্য কমতে থাকলে সমিতিরও বিলুপ্তি ঘটে।
এখনো অনেকে কম্পিউটার, প্রিন্ট ব্যবহার করে দলিল তৈরী করেন জানিয়ে সুনিল বরণ বলেন, আজকের দিনেও অনেকের কাছে আমরাই ভরসা। আমাদের মেশিনের টাইপ যুগ থেকে যুগ নষ্ট হয় না। কম্পিউটার, প্রিন্টারে তৈরী দলিলগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, নানা রকম চুক্তির ড্রাপ্ট করার জন্য কিছু কিছু লোক আমাদের কাছে আসেন। এর বাইরে অন্যকোনো কাজ তেমন আসে না। আদালত থেকে জেরা–জবানবন্দির কিছু কাজ পাই। সেগুলো করেই আমাদের কোনো রকম চলছে।
শুরুর ইতিহাস মনে করে সুনিল বরণ দে এ প্রতিবেদককে বলেন, কালুরঘাট এলাকায় একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। একসময় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে জীবিকার তাড়নায় বাধ্য হয়ে আদালত পাড়ায় চলে আসি। সেই চাকরিতে টাইপ করাই আমার কাজ ছিল। যার কারণে আদালত পাড়াকে বেছে নেয়া। সেই সময় টাইপিস্টদের খুব কদর ছিল। আইনজীবী থেকে বিচারক সবার কাছেই আমাদের একটা গুরুত্ব ছিল। মামলা সংক্রান্ত নথিপত্র তৈরীর ক্ষেত্রে আদালত পাড়ায় এক সময় আমরাই ছিলাম ভরসা। এখন চলে গেছি সব হারাদের দলে।












