খাতুনগঞ্জে ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্ন করার উদ্যোগ নিন

| বৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ইতিহাসে খাতুনগঞ্জ এক অনন্য নাম। চট্টগ্রামের এই বাণিজ্যিক এলাকাটি সবার কাছে জনপ্রিয়। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পাইকারী বাজার। চট্টগ্রাম নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের আনাগোনায় প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এ বাজার। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্য এসে জমা হয় এই বাজারের আড়তগুলোতে। প্রায় দেড়শ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এ বাজারের সাথে দেশের অর্থনীতির প্রবাহ সমৃদ্ধি ও উন্নতির বিষয় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। এ বাজার মূলত দেশের সকল প্রকার খাদ্যনিত্যপণ্যসহ মানুষের মৌলিক চাহিদার অধিকাংশই যোগান দিয়ে থাকে। এই বাজারের উপর নির্ভর করে দেশের পণ্যদাম, পণ্য সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ। এখান থেকেই তৈরি হয়েছে দেশের স্বনামধন্য শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও সমাজপতির। চট্টগ্রামসহ দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বের বিশাল একটি অংশ এ খাতুনগঞ্জচাকতাই থেকেই উঠে এসেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে খাতুনগঞ্জের সেই জৌলুস আর নেই। নানা রকম সংকটে জর্জরিত এ বাজার। গত ১৫ জুলাই দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়েছে ‘বহুমুখী সংকটে সংকুচিত হচ্ছে খাতুনগঞ্জের বাজার’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক জৌলুস আর আগের মতো নেই। বহুমুখী সংকটে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে বাজার। এক সময় খাতুনগঞ্জ থেকে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ হলেও গত ১৫২০ বছর ধরে সেটি কমতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সরু সড়কে নিত্য যানজট, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং চেক প্রতারণাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর টাকা মেরে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। শুধু তাই নয়, বিগত কয়েক দশকে খাতুনগঞ্জ থেকে অনেক বড় বড় শিল্প গ্রুপ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নানা সমস্যার কারণে খাতুনগঞ্জে ব্যবসা কমে গেছে। এছাড়া শত শত বছর ধরে চলে আসা মৌখিক বিশ্বাসের ওপর লেনদেনের সংস্কৃতিতেও ধরেছে বড় ফাটল। অন্যদিকে বর্তমানে ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের বড় দারোগা হাটের ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেলের কারণে অনেক আমদানিকারকরা নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এবং যশোর নওয়াপাড়াতে পণ্য আনলোড করছেন। আগে এক সময় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি সব পণ্য চাক্তাই খাতুনগঞ্জে আসতো। তারপর সেখান থেকে নৌপথে এবং সড়কপথে আশপাশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় যেত। এখন সেই সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে।

ইতোপূর্বে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের এক সভায় ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কে স্থাপিত ওজন স্কেল প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল। সভায় বক্তারা বলেন, ‘খাতুনগঞ্জ শুধু চট্টগ্রাম নয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। তবে এটি ঠিক নানা কারণে খাতুনগঞ্জের আগের মতো জৌলুস নেই। এক সময় এই খাতুনগঞ্জ থেকে সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পরিবহন করা হতো। খাতুনগঞ্জে ব্যবসায়ীরা আবার বৈষম্যের শিকারও হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কে ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেলের কারণে এখানকার ব্যবসায়ীরা ট্রাকে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারছেন না। অথচ ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়ক ছাড়াও দেশের আর কোনো মহাসড়কে ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেল নেই।’

বলা হয়ে থাকে, মৌখিক বিশ্বাসই ছিল খাতুনগঞ্জের লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বছরের পর বছর এই প্রথাই চলে আসছিল। কিন্তু টানা কয়েকটি প্রতারণায় ঘটনায় সেই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে। ফলে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস আগের জায়গাতে নাই। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হবে। পারস্পরিক বিশ্বাস স্থাপনে কাজ করতে হবে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে।

নানাবিধ সমস্যা বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শত বছর ধরে চাকতাই খালের মাধ্যমে নৌপথে ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালনায় চাকতাইখাতুনগঞ্জের গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে, তা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিবছর জলাবদ্ধতায় ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এ অবস্থার অবসান জরুরি। চাকতাই খাল খননসহ ওই এলাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাঁরা বলেন, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ সরকারি বিনিয়োগের তিন গুণ যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে থাকে। তাই চাকতাইখাতুনগঞ্জে ব্যবসাবাণিজ্য নির্বিঘ্ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে ঐতিহ্যবাহী এই বাজারের।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে