টানা প্রবল বৃষ্টিতে কক্সবাজারে জেলাজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে পাহাড় ধসে আরো তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে দুই দিনে ১৩ জন মারা গেছে। পাহাড়ি ঢল ও সাগরের পানিতে জেলার ৯টি উপজেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়নের বহু লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। পানিতে রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবিদিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
জেলা প্রশাসন জানায়, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল এবং বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বাড়ায় রামু ও চকরিয়ার ২০টির বেশি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকশ ঘরবাড়ি। এছাড়া সাগরের পানিতে টেকনাফ, উখিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, ঈদগাঁও, কুতুবদিয়ার বিভিন্ন গ্রাম ও কক্সবাজার পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে।
অন্যদিকে পাহাড় ধসে কক্সবাজার শহরতলীর দরিয়ানগর এলাকায় লিমা আক্তার (২৫) নামের এক নারী নিহত হয়েছেন। এসময় তার স্বামী জসিম উদ্দীন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে উখিয়ার হলদিয়া পালংয়ের পাহাড়ি এলাকা জামতলী দেয়াল ধসে আবদুল মালেক (৪০) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। এসময় তিনি ভাত খাচ্ছিলেন। এছাড়া মহেশখালীর সোনাদিয়ার পশ্চিম পাড়ায় বৃষ্টির জমাট হওয়া পানিতে ডুবে রোমাইসা নামের ২১ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে বৃষ্টির কারণে রোববার দিবাগত রাতে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় আশ্রয়শিবিরে ৮ জন রোহিঙ্গা, কক্সবাজার শহরে একজন এবং পেকুয়া উপজেলায় মাটির ঘর ধসে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃষ্টিতে জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে টেকনাফে। উপজেলার হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জেলা শহরের, হোটেল–মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা, বাজারঘাটা, কালুর দোকান, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল, বাস টার্মিনাল ও বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এছাড়া কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী–কৈয়ারবিল সড়কের একটি জরাজীর্ণ সেতু ধসে পড়ে দুই এলাকার মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এছাড়া ভারী বৃষ্টিপাত ও বৈরি আবহাওয়া বিরাজমান থাকায় চারদিন ধরে সেন্টমার্টিন–টেকনাফ নৌপথে যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। একই কারণে দ্বীপের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী গতকাল টেকনাফ এসে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। তাঁদের পুনরায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন। একইভাবে মহেশখালী–কক্সবাজার নৌ–রুটে সী ট্রাকসহ সব ধরণের নৌযানও চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে দ্বীপের লোকজন ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে রোগীরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, আগামী দুই দিনও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়বে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় কক্সবাজার শহর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় মাইকিং ও প্রচারণার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিন আরও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তাই পাহাড়ধসে আর কোনো প্রাণহানি যেন না ঘটে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।











