বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ভক্ত–সমর্থককে কাঁদিয়ে এবারের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ব্রাজিল। নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর ম্যাচটি ২–১ গোলে হেরেছে তারা নরওয়ের কাছে। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির ভাইকিং যোদ্ধা আর্লিং হালান্ড জোড়া গোল করে একাই ব্রাজিলের স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছেন। তার জোড়া গোলের জবাব দিতে পারেনি পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল। এদিকে চলতি আসরে গোল্ডেন বুটের লড়াইটা জমে উঠল হালান্ডের দুই গোলে। এই বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির সমান সাতটি গোল করলেন হালান্ড।
বিশ্বকাপে নামার আগেই অবশ্য ক্লাব ফুটবলে তারকা হয়ে ওঠেন হালান্ড। ম্যাঞ্চেস্টার সিটির বড় ভরসা তিনি। ২০২৩ সালে শুধু প্রিমিয়ার লিগে ৩৬ গোল করে এক মওসুমে সর্বাধিক গোলের রেকর্ড গড়েছেন। জিতেছেন প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। সেই হালান্ড এ বার ডানা মেলছেন বিশ্বকাপে। সুযোগ পেলে তা কাজে লাগানোই হালান্ডের দায়িত্ব। বক্স স্ট্রাইকার তিনি। নিজের কাজ করে দেখিয়েছেন। খেলা শেষে হালান্ড বলেন,‘যদি এক–দুটো সুযোগ পাই, তার মধ্যেই গোল করে ফেলি। আমি জানি না কী ভাবে করি। কিন্তু হয়ে যায়।’
অপরদিকে সুন্দর ফুটবল খেলতে অভ্যস্ত ব্রাজিল নরওয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই পারেনি। নরওয়ের কাছে হারের পর কাসেমিরো বলেছেন, ‘আমি দুঃখিত। মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাদের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। ব্রাজিলের প্রত্যেকটা শিশু বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখে। এটা সকলের স্বপ্ন। আমি তিন বার বিশ্বকাপ খেলতে পেরে ভাগ্যবান। তবে এক বারও জিততে পারলাম না। আমরা এমন একটা প্রজন্ম হিসাবে থেকে যাব যারা কোনো দিন ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ দিতে পারেনি।

অতীতে গ্যারিঞ্চা, ভাভা, টোস্টাওয়ের দল ১৯৮২–তে সাড়া জাগিয়েও ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারেনি। তেমনই প্রধান দাবিদার থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৮–এ ফাইনালে হেরেছিল ব্রাজিল। বস্তুত, এ বার যে ব্রাজিল ট্রফি জেতার ক্ষমতা রাখে তা অনেকেই মানতে চাননি।
খেলার শুরুতেই ব্রাজিলের জন্য সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে পেনাল্টি কিকে ব্যর্থ হলেন ব্রুনো গিমারাইস। পরে লম্বা সময় আক্রমণে আধিপত্য করল নরওয়ে। দ্বিতীয়ার্ধের শেষদিকে জ্বলে উঠলেন হালান্ড। ১১ মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে থামিয়ে দিলেন ব্রাজিলের দৌড়। অসাধারণ এক জয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার–ফাইনালে উঠল নরওয়ে। নরওয়ের এই স্মরণীয় সাফল্যের মূল নায়ক হালান্ড হলেও ম্যাচ জুড়ে দুর্দান্ত সব সেভ করে পার্শ্বনায়ক অবশ্যই গোলরক্ষক আরিয়ান হশল নিলাদ। শুরুতেই ব্রুনো গিমারাইসের পেনাল্টি শট আটকে প্রতিপক্ষকে বড় একটা ধাক্কা দেন তিনি। কেবল ৩০ শতাংশের একটু বেশি সময় পজেশন রেখে গোলের জন্য ১৪টি শট নিয়ে চারটি লক্ষ্যে রাখতে পারে ব্রাজিল। নরওয়ের ৯ শটের পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে। ভয়ডরহীন নরওয়ে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তারই একটা ইঙ্গিত যেন মেলে ম্যাচের শুরুতেই।
দ্বিতীয়ার্ধে দারুণ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করে ব্রাজিল, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থতা হয় সঙ্গী। এই সময়ে সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পান ৫৮তম মিনিটে কুইয়ার বদলি নামা এন্দ্রিক। পরের মিনিটেই প্রতি–আক্রমণে বাঁ দিক থেকে ডি–বঙের বাইরে দুর্দান্ত এক থ্রু বল বাড়ান ভিনিসিউস। বল ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণেও নেন এন্দ্রিক। কিন্তু ওয়ান–অন–ওয়ানে এগিয়ে আসা গোলরক্ষকের চ্যালেঞ্জের মুখে লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন তিনি। তিন মিনিট পর আবার গোলরক্ষকের নৈপুণ্যে রক্ষা হয় নরওয়ের। ৬৭তম মিনিটে জোড়া পরিবর্তন করেন আনচেলত্তি; মার্তিনেল্লি ও হায়ানকে তুলে নেইমার ও দানিলো সান্তোসকে নামান কোচ। তারা কেউই অবশ্য দলকে বাঁচাতে পারেননি। ৭৯তম মিনিটে স্বরূপে হাজির হন দীর্ঘদেহী হালান্ড। বাঁ দিক থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরিপের ক্রস ছয় গজ বঙের বাইরে পেয়ে, সবার ওপরে লাফিয়ে হেডে ব্রাজিলকে হতভম্ব করে দেন। তার পাশেই ছিলেন গাব্রিয়েল মাগালাইস, কিন্তু তিনি পারেননি প্রতিপক্ষকে মোটেও চ্যালেঞ্জ জানাতে। জাতীয় দলের হয়ে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে জালের দেখা পান হালান্ড। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে ব্রাজিলের ডি–বঙের বাইরে থেকে, আচমকা নিচু জোরাল শটে আরেকটি গোল করেন তিনি। আট মিনিট যোগ করা সময়ের শেষ দিকে কাসেমিরো ডি–বঙে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। এবং সফল স্পট কিকে বিশ্বকাপে আরেকটি গোল পাওয়ার হাসি ফুটে ওঠে নেইমারের মুখে। তবে, ম্যাচের চিত্রপট তা বদলাতে পারেনি। একটু পরই বাজে শেষের বাঁশি, কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার,ব্রাজিলের অগণিত ভক্ত সমর্থক। নরওয়ের বিপক্ষে এই পর্যন্ত পাঁচটি ম্যাচ খেলে তিনটিতেই হারল ব্রাজিল, বাকি দুটি ড্র। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে লাতিন আমেরিকার দলটিকে একই স্কোরলাইনে হারিয়েছিল নরওয়ে।












