(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
রাত বাড়ার সাথে সাথে সিডনি যেন এক নতুন শহরে রূপ নেয়। ক্যানবেরা থেকে ফিরে আমরা যেনো এক নতুন শহরে প্রবেশ করলাম। দিনে দেখা সিডনির সাথে এই শহরের যেনো কোন মিলই নেই। দিনের ব্যস্ততা তখনও থেমে যায় নি, কিন্তু শহরের ছন্দ বদল হয়ে গেছে। আকাশে গাঢ় নীলের ওপর ধীরে ধীরে কালো রঙের পরত জমে পুরো আকাশটাই অন্যরকম হয়ে গেছে। রাতের অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে শহরজুড়ে জ্বলে ওঠেছে অসংখ্য আলো। মনে হয়, দক্ষিণ গোলার্ধের এই শহরটি যেন রাতকে ঘুমের জন্য নয়, বরং নতুন করে শুরু করার জন্য সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে।
ক্যানবেরা থেকে ফেরার পর ছোটভাই রুবেলকে বললাম, আমাদের হোটেলে নামিয়ে দাও, তুমি ঘরে ফিরে যাও। কিন্তু রুবেল বললো, চলুন, আপনাদের একটু রাতে সিডনি দেখিয়ে নিই। রাতের সিডনি যে এমন অপরূপ সাজে নিজেকে সজ্জিত করে পর্যটকদের মন ভোলানোর চেষ্টা করে তা আমার জানা ছিল না। সিডনি প্রবাসী রুবেল নিশ্চয় এই রূপ সম্পর্কে জানতো, তাই সে আমাদের সিডনির অপরূপ সৌন্দর্য দেখানোর জন্য সাতশ’ কিলোমিটার জার্নি করার পরও রাস্তায় নামলো।
রুবেল আমাদেরকে নিয়ে সিডনি হারবারের পাশে গেলো। দিনের বেলা এই হারবারে ঘুরেছি আমরা। কিন্তু রাতের সৌন্দর্য যে পুরোটাই অন্যরকম তা জানা ছিল না। রুবেল গাড়ি পার্ক করে আমাদের নিয়ে হেঁটে হারবারের দিকে আসছিল। দূর থেকে চোখে পড়ছিল আলোকিত অপেরা হাউসের শুভ্র পালগুলো। দিনের আলোয় যে স্থাপনাটি শিল্পের প্রতীক, রাতের আলোয় সেটি যেন ভেসে ওঠে এক অলৌকিক সৌন্দর্যে। এর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল হারবার ব্রিজে সারি সারি আলোর মালা, যেন আকাশের নক্ষত্রগুলো নেমে এসে লোহার কাঠামোর গায়ে বসেছে। পানির শান্ত ঢেউয়ে সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করছিল এক অপূর্ব দৃশ্য। মনে হচ্ছিল, শহর আর সমুদ্র যেন একে অপরের আয়নায় নিজেদের রূপ দেখছে। রুবেল বললো, এমন রূপ আপনি দুনিয়ার আর কোথাও দেখেছেন কিনা আমি জানি না। তবে সিডনি হারবার এবং অপেরা জ্যোৎন্সায় যে কী পরিমাণ মুগ্ধতা ছড়ায় তা কোটি টাকা দিয়েও দুনিয়ার কোথাও পাবেন না।
আসলেই তাই। আমি মুগ্ধ হয়ে সিডনি হারবার এবং অপেরা হাউজ দেখছিলাম। দেখছিলাম আকাশের ভরা জ্যোৎস্না। কী যে অপরূপ! চাঁদের আলোয় অপেরা হাউজের রূপ যেনো উর্বশীর সৌন্দর্যকেও মলিন করে দিচ্ছিলো। সাদা পাথরের পাল তোলা চমৎকার স্থাপত্যটি চাঁদের আলোয় অন্যরকম লাগছিলো। রুবেলের চোখে মুখে তৃপ্তি, সে যেনো আমাদের পৃথিবীর সেরা একটি সুন্দর স্থাপত্য দেখাতে পেরেছে। ক্যানবেরা থেকে সিডনি পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে আসা যাওয়ার ক্লান্তি তার চোখে মুখে দেখা যাচ্ছিলো না, সে তৃপ্ত আমাদের অপরূপ সৌন্দর্য দেখিয়ে!
শুধু আমরা একা নই। আরো প্রচুর পর্যটক হাঁটছিলো পুরো এলাকায়। এমন সৌন্দর্য কে বা হাতছাড়া করতে চায়! রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কানে ভেসে আসছিল নানা ভাষার মানুষের কথোপকথন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকের ভিড়ে বোঝা যায়, সিডনি শুধু একটি শহর নয়, এটি বহু ভাষাভাষী এবং বহু সংস্কৃতির মিলনস্থল। রাস্তার পাশে ছোট ছোট ক্যাফে, রেস্তোরাঁ আর খোলা আকাশের নিচে বসে থাকা মানুষের মুখে ছিল প্রশান্তির ছাপ। কেউ রাতের খাবার উপভোগ করছেন, কেউ গিটার বাজিয়ে গান গাইছেন, আবার কেউ নিঃশব্দে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। আমরা তিনজন কেবলই হাঁটছিলাম। পায়ে পায়ে আনন্দ নিচ্ছিলাম।
শহরের উঁচু উঁচু ভবনের কাচের দেয়ালে আলো ঝলমল করছে। কোথাও আবার শুরু হয়েছে রাতের আড্ডা। সড়কে চলমান ট্রাম, বাস আর গাড়ির আলোর রেখা সিডনির পরতে পরতে যেনো জীবনের জয়গান রচনা করছিলো। প্রচুর মানুষ গল্প করছিলো। কোথাও বা গিটারে গানের সুর তুলে ছন্দ ও লয়ের খেলা খেলছিলো। কিন্তু কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। কোথাও নেই কোন অসংগতি। সড়কের পথচারী কিংবা আড্ডার মানুষটি নিজেদের মতো করে সময় পার করছিলো। কোথাও কোন বিশৃংখলা নেই। নেই কোথাও কোন অসংগতি। রাস্তায় শত শত গাড়ি চলছে। কিন্তু কোথাও একটিও হর্ণের শব্দ নেই। নেই কোন বিশৃংখলা। পুরো শহরটিকে মনে হচ্ছিলো একটি ছন্দে এগিয়ে চলছে। একই সুরে গান গাচ্ছে।
রুবেল আমাকে এবং লায়ন বিজয় শেখর দাকে নিয়ে একটি ফেরিতে উঠলো। আমার ইচ্ছে না থাকলেও রুবেলের জোরাজুরিতে ফেরিতে চড়ে বসলাম। সে বললো, এমন সুযোগ পর্যটকদের জন্য বারবার আসে না। আপনি পরে আফসোস করবেন। ফেরি সাগরের কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হলো রুবেল ঠিকই বলেছে। রাতের সিডনিকে নদীপথ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। ফেরি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল, আর চারপাশে আলোয় মোড়া শহর যেন আরও কাছে চলে আসছিল। বাতাসে ছিল সমুদ্রের নোনতা গন্ধ, সঙ্গে হালকা শীতল স্পর্শ। দূরে অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজ আর আকাশচুম্বী ভবনগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো শিল্পী অন্ধকার ক্যানভাসে নিখুঁত তুলির আঁচড়ে একটি ছবি এঁকেছেন। যে ছবিতে শুধু একটি শহরই নয়, সুন্দর একটি জীবনের চিত্রই যেনো অংকং করেছেন। সাগর থেকে সিডনির স্কাই লাইন কি যে সুন্দর লাগছিলো!
নদীতে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ফিরে আসলাম আমরা। দিনের বেলায়ও এমন নৌভ্রমন করেছি, তবে রাতের সৌন্দর্য্যের সাথে দিনের দেখা সাগরের কোন মিলই খুঁজে পাওয়া গেলো না। রাতের সৌন্দর্য যেনো একটু অন্যরকম।
রাতের সিডনির আরেকটি সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তার মানুষের জীবনযাত্রায়। রাত গভীর হলেও নিরাপত্তার অনুভূতি স্পষ্ট। নারী–পুরুষ, বৃদ্ধ কিংবা তরুণ–অনেকে নিশ্চিন্তে হাঁটছেন, কেউ সাইকেল চালাচ্ছেন, কেউ আবার নদীর ধারে বসে গল্প করছেন। শহরের পার্কগুলোতেও মানুষ সময় কাটাচ্ছেন। কোথাও শিশুদের হাসি, কোথাও প্রেমিক–প্রেমিকার নীরব উপস্থিতি, আবার কোথাও বন্ধুদের প্রাণখোলা আড্ডা্তসব মিলিয়ে শহরটি যেন জীবনের এক রঙিন ক্যানভাস।
হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম এমন এক স্থানে, যেখান থেকে পুরো শহরের স্কাইলাইন এক নজরে দেখা যায়। দূরে অসংখ্য আলোকিত ভবন, মাঝখানে হারবার, আর ওপরে নির্মল রাতের আকাশ। দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্রগুলোও যেন শহরের আলোকে সঙ্গ দিচ্ছে। আমার মনে হলো, আধুনিকতার মধ্যেও প্রকৃতির সঙ্গে এমন সুরেলা সহাবস্থান খুব কম শহরই তৈরি করতে পেরেছে।
আচমকা বৃষ্টি শুরু হলো, গুটিগুটি। পুরো শরীর জুবুথুবু হয়ে যাওয়ার মতো বৃষ্টি নয়, তবুও আমরা দৌঁড়ে গিয়ে গাড়ি চড়লাম। রুবেলের গাড়িটিই যেনো আমাদের রক্ষাকবচ হয়ে দেখা দিল।
রুবেল গাড়ি চালিয়ে আমাদের নিয়ে গেলো হারবার ব্রিজের নিচে। দিনের বেলায় উপর থেকে এই ব্রিজ দেখেছিলাম। এখন নিচ থেকে দেখে পুরোটাই অন্যরকম লাগছিলো। ব্রিজের অবকাঠামো এবং নাট বল্টুর এক একটি সাইজ দেখে মনে হচ্ছিলো আজ থেকে শতবর্ষ আগে এরূপ নাটবল্টু কি করে বানানো হলো, কি করে এতো নিখুঁতভাবে একটি ব্রিজ তৈরি করা হলো। দিনের বেলা বুঝতে না পারলেও এখন রাতের বেলায় ব্রিজের নিচে নেমে এক একটি নাট বল্টুর যে সাইজ দেখলাম তাতে আমার মাথা আক্ষরিক অর্থেই ঘুরে গেলো। এক হাত লম্বা এক একটি বল্টু, এক একটি নাটও এক দেড় ফুট! কী করে বানালো এগুলো, লাগালোই বা কী করে!! স্টিল স্ট্রাকচারের ব্রিজটি কী করে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে! (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।










