লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে সরকারি আবাসনে বসবাস করেও নিয়মিত বাড়িভাড়া দিচ্ছেন না কর্মকর্তা–কর্মচারীরা। বছরের পর বছর জমে থাকা এসব বকেয়া ভাড়ার কারণে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা, ভাড়া আদায়ে শিথিলতা ও কার্যকর তদারকির অভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবনগুলোতে বসবাসকারীদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে মাসিক ভাড়া আদায়ের বিধান থাকলেও বাস্তবে তার ব্যত্যয় ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া ভাড়া আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ক্রমে বাড়ছে। জানা যায়, উপজেলা পরিষদ চত্বরে আবাসিক ভবন রয়েছে ৭টি। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ৫টি এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) ২টি। প্রতিটি ভবন দ্বিতল। প্রতিটি ভবনে রয়েছে ৪টি করে ইউনিট। এলজিইডির ভবনে ২০টি ইউনিটের মধ্যে ৩টি ও বিআরডিবির ভবনে ৮টি ইউনিটের মধ্যে ২টি খালি রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এলজিইডির শাপলা ভবনে বসবাস করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফয়সাল আমির। জুঁই ভবনে বাস করেন উপজেলা কৃষি অফিসের সহকারী, এলজিইডি অফিসের দেলোয়ার হোসাইন ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ননী বালা ত্রিপুরা। এছাড়া আছে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিস। টগর ভবনে আছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আনসার ক্যাম্প ২টি, বাস করেন আনসার সদস্য মহিলা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ড্রাইভার নাজিম উদ্দিন। জবা ভবনে বসবাস করেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাওলানা আবদুল গফুর, এলজিইডি অফিসের শিশির কুমার, বিআরডিবি পজীপ প্রকল্প অফিসের সুপ্তি বড়ুয়া ও আফসানা। শিউলী ভবনে বাস করেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রিকল চাকমা ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু জাফর। তবে তারা কতদিন যাবত সরকারি আবাসন ভোগ করছেন এবং কার কী পরিমাণ ভাড়া বাকি আছে তা জানা যায়নি।
উপজেলা বিআরডিবি অফিস সূত্রে জানা যায়, বেলি ও চামেলি নামে ২টি ভবনে বাস করেন উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা শাহিন আক্তার, লিপিনা চাকমা ও ফারজানা আক্তার, পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তা রোজিনা আক্তার, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সিএ ইলিয়াছ রুবেল ও এলজিইডির সোহেল। মোট ভাড়া বাকি ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৮৬ টাকা। ১৩ এপ্রিল ভাড়া আদায়ের জন্য সর্বশেষ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ৩ জন বসবাসকারী ৫৩ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে সরকারি আবাসনে বসবাসরত অনেক কর্মকর্তা–কর্মচারী নিয়মিত বাড়িভাড়া পরিশোধ করছেন না। অনেকে আবাসনে ওঠার পর বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও আজ পর্যন্ত কোনো ভাড়া পরিশোধ করেননি। ফলে সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে আবাসনের ভবনগুলো কাঠামোগতভাবে এখনো ব্যবহার উপযোগী থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে সেগুলোকে পরিত্যক্ত ও বসবাসের অনুপযোগী ঘোষণা করার উদ্যোগ নিচ্ছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলে সেখানে অবস্থানরত কর্মকর্তা–কর্মচারীরা বিনা ভাড়ায় বসবাসের সুযোগ পাবেন। এতে সরকার লাখ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন সরকারি আবাসনের সুবিধা ভোগ করেও ভাড়া পরিশোধ না করে অনেক কর্মকর্তা–কর্মচারী ইতোমধ্যে অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন বলেও জানা গেছে। তাদের কাছ থেকে বকেয়া ভাড়া আদায়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, সরকারি আবাসনের ভাড়া তুলনামূলকভাবে কম। তারপরও যদি নিয়মিত ভাড়া আদায় না হয় তাহলে তা সরকারি শৃঙ্খলা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য নেতিবাচক বার্তা দেয়।
সরকারি আবাসিক ভবনের ভাড়া বকেয়া সংক্রান্ত তথ্য জানতে লোহাগাড়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদের সাথে অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। প্রতিবারই তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সরকারি বাসা বরাদ্দ কমিটির সভাপতির কাছ থেকে অনুমতির কথা বলে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
পরে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সরকারি বাসা বরাদ্দ কমিটির সভাপতি মো. বায়েজীদ–বিন–আখন্দের সাথে অফিসে কয়েকবার যোগাযোগ করা হয়। সর্বশেষ গত ২৩ জুন তথ্যের জন্য গেলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ‘ঘাপলা’ রয়েছে। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করার পরামর্শ দেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি প্রফেসর সিকান্দার খান বলেন, সরকারি আবাসনে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বসবাস করা স্বাভাবিক বিষয়। তবে সেখানে অবস্থান করলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত বাড়িভাড়া পরিশোধ করাও তাদের দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ভাড়া বকেয়া থাকলে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বকেয়া ভাড়া দ্রুত আদায় ও সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।












