‘বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে খাল–নালায় বর্জ্য পেলেই ব্যবস্থা’– এরকম কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল একসময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। তখন মনে হয়েছিল নড়েচড়ে বসেছিলেন নগরের বাসিন্দারা। কেননা তাঁরা তখনো পর্যন্ত এরকম কড়া নির্দেশ পাননি, যে কারণে ঢিলেঢালা জীবনপ্রণালীতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। যে যেখানে পারছেন, ময়লা ফেলছেন, গৃহস্থালী বর্জ্য ফেলছেন, পলিথিন ফেলে নালা–নর্দমা ভরাট করে ফেলছেন, কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, নেই আফসোস। এমতাবস্থায় এ নির্দেশনায় তাঁদের টনক নড়ারই কথা। কিন্তু ফল হয়নি। অনবরত বর্জ্য ফেলে ভরাট করা হচ্ছে নগরের খালগুলো। গত ২২ জুন ‘নানা কর্মযজ্ঞ, তবুও ভরাট হচ্ছে নগরের খালগুলো’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক আজাদীতে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। খাল পুনঃখনন, সমপ্রসারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, স্লুইচগেট নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নানামুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নগরীর জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর। কিন্তু নগরীর অধিকাংশ খালের তলদেশ আবারও পলিথিন, প্লাস্টিক, গৃহস্থালি বর্জ্য, নির্মাণসামগ্রী, পাহাড়ের মাটি, বালি এবং পলিতে ভরে যাচ্ছে। ফলে খালগুলোর গভীরতা ও পানিধারণ ক্ষমতা দ্রুত কমে ভারী বৃষ্টিতে নতুন করে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে একনেকে অনুমোদিত ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সমপ্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নগরীর প্রধান খালগুলো পুনঃখনন ও সংস্কার করা হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা, পরে যা বৃদ্ধি পেয়ে ৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। প্রকল্পের মেয়াদও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টির বেশি খাল ও উপ–খালে ব্যাপক খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে। খালের তলদেশ থেকে লাখ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রকল্পের আওতায় খাল থেকে ভাঙা খাট–পালং, তোষকসহ এমন কোনো পণ্য নেই যা অপসারণ করা হয়নি। খাল খননের পাশাপাশি অনেক স্থানে খালের প্রশস্ততাও বাড়ানো হয়েছে। খালের পাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা। কিন্তু ইতোমধ্যে বহু খালে আবারও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য, পলি ও মাটি জমে গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সরেজমিনে একাধিক খালে জমে যাওয়া মাটিতে আগাছা জন্মাতে দেখা গেছে। অথচ বছরখানেক আগে এসব খাল থেকে মাটি, বালি ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার। রাস্তায়, পুকুরে, নদীতে যত্রতত্র পলিথিন ফেলে পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ করা হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় হলো পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করা। সেই সঙ্গে সব খাল, পুকুর, ডোবা, জলাশয়গুলোকে দখলমুক্ত করতে হবে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মিত তদারকির ঘাটতিও লক্ষণীয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের খাল ও ড্রেন পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও তা করা হয় কিনা সন্দেহ। ফলে নালা দখল, নালা ও খালের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্নভাবে নালা–খাল ভরাট হয়ে থাকে। তাই ড্রেনেজ অব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য অপসারণে ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই এড়াতে পারে না। বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও কার্যকর কোনো পদ্ধতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা, ড্রেনগুলোর সংস্কারকাজে অযথা সময়ক্ষেপণ এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্ন না করা, নাগরিকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যর্থতা ইত্যাদি বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
এ অবস্থায় খাল–নালায় যারা ময়লা–আবর্জনা ফেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে সিটি করপোরেশনকে। সংস্থাটির ম্যাজিস্ট্রেটকে বিশেষ দায়িত্ব দিতে হবে, যার নেতৃত্বে চলবে নিয়মিত চলবে ভ্রাম্যমাণ আদালত। একইসঙ্গে খাল–নালায় যারা ময়লা–আবর্জনা ফেলবে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এছাড়া সাধারণ মানুষ যদি খাল–নালায় ময়লা ফেলা কোনো ব্যক্তির তথ্য–প্রমাণ দেয় সেক্ষেত্রেও অভিযান চালিয়ে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।








