আবার হরমুজ বন্ধের ঘোষণা ইরানের

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৩২ তেহরান-ওয়াশিংটন বৈঠক আজ : পাকিস্তান

আজাদী ডেস্ক | রবিবার , ২১ জুন, ২০২৬ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হওয়ার পর যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে তেহরান। এর জবাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা আজ রোববার সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও চলমান উত্তেজনার কারণে সেই প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর শীর্ষ যৌথ কমান্ডের কেন্দ্রীয় সদরদপ্তর খাতাম আলআনবিয়া গতকাল শনিবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। বিবৃতিতে বলা হয়, এটি শত্রুপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জবাবে নেওয়া প্রথম পদক্ষেপ। আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে শত্রুপক্ষকে তাদের অঙ্গীকার পালনে বাধ্য করতে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ সমাপ্তি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘিত হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং ওই অঞ্চল থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার না হওয়াকে তারা এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দক্ষিণ লেবাননে লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের ওপর চলমান হামলা এবং যুদ্ধবিরতির বারবার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানসংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তেহরান সীমিত শর্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু লেবাননের সামপ্রতিক পরিস্থিতির জেরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে দেশটি। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় স্বাক্ষর করেন। কয়েক সপ্তাহব্যাপী আলোচনার পর চূড়ান্ত হওয়া ওই নথিতে ফারসি ও ইংরেজিদুই ভাষাতেই স্বাক্ষর করা হয়।

ইরানি কর্মকর্তারা সমঝোতা স্মারকটিকে একটি রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করতে প্রণীত হয়েছে। সমঝোতা স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের নিজ নিজ মিত্রদের মধ্যে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকার অঙ্গীকার করা হয়েছে। নথিটিতে লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে গতকাল শনিবার লেবাননে নতুন করে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটার পর পুরো প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গতকাল ইসরায়েলের একাধিক বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। ইরান অভিযোগ করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তেহরান বলেছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধের সিদ্ধান্ত সেই লঙ্ঘনের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও লেবাননের ইরানসমর্থিত প্রতিরোধ সংগঠন হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে বিমান ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইসরায়েল। লেবাননের সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, নাবাতিয়েহ জেলায় ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত এবং আরও ১২ জন আহত হয়েছেন। লেবাননের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, কাফর রেমান গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় এক লেবাননি সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, টায়ার জেলার বারাশি গ্রামে এক হামলায় একই পরিবারের বাবা, মা এবং তাদের দুই সন্তান নিহত হয়েছেন। সিডন জেলার কানারিত এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং আরও ১৩ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের অবস্থানের ওপর হিজবুল্লাহ ৫০টির বেশি রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনা ও অবস্থান।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে ওয়াশিংটন। গত মার্চে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট হামলা চালালে লেবানন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রইরান সংঘাতের এক নতুন রণাঙ্গনে পরিণত হয়। মার্চে হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলার জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে। বর্তমানে নিজেদের উত্তর সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের দূরে সরিয়ে রাখতে দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ৫ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লেবাননে চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বহু জনপদ ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাবা তুমি ভালোবাসা বাবা তুমি নির্ভরতা
পরবর্তী নিবন্ধপটিয়ায় মাদকবিরোধী মাইকিং ও মিছিল