বিশ্বকাপ ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন্ আর্থ’। এবারের আসরে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক ৪৮ দলের ৮২৪ জন খেলোয়াড় ১২ গ্রুপে অংশ নিচ্ছে। অ্যামেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকো–এই তিন দেশের ১৬টা স্টেডিয়ামে এই মহারণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী ২০ জুলাই অ্যামেরিকার নিউজার্সি স্টেডিয়ামে তার ফাইনাল। বিশ্বকাপের শিরোপা জিতবে এক দল তথা এক দেশ। আর দর্শক গোটা বিশ্বের আপামর মানুষ। বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল এক ক্রীড়া আসর নয়। তা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আবেগের মিলনমেলা। বিশ্বের তাবৎ ফুটবল প্রেমিদের মতো বিশ্বকাপ নিয়ে মেতে থাকবে এ দেশের আপামর মানুষ। তারাও আজ বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত। এই জ্বরের কারণ কোন ভাইরাস কিংবা অন্য কোন জীবাণু নয়। তা কেবল ফুটবলের প্রতি হৃদয় উৎসরিত আবেগ আর ভালোবাসা। কথিত আছে, হৃদয় তথা হৃৎপিণ্ড ভালোবাসার উৎপত্তিস্থল, আবেগের উৎস, সাহসের ঠিকানা আর আত্মার আশ্রয়স্থল। ফুটবলের সাথে হৃদয়ের এই যোগসূত্র বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের জমকালো আয়োজনে তার থিম্ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। এই আসরের থিম্ হচ্ছে ‘ঞযৎবব ঘধঃরড়হং ঙহব ঐবধৎঃ”। তিন আয়োজক দেশের এক হৃদয়ের আহ্বানে এই আয়োজন। তিন দেশের সম্মিলিত আবেগ ও অনুভূতির বহি:প্রকাশকে এই প্রতিপাদ্য ও বিশ্বকাপের থিম্ সংগীতে তুলে ধরা হয়েছে। এতে শরিক হচ্ছে সারা বিশ্ববাসী। প্রতি ম্যাচের শুরুতে তা আরো সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়। ম্যাচের কিক্ অফের আগে স্ব স্ব টিমের খেলোয়াড়রা তাদের জাতীয় সংগীতের সময় মাঝ মাঠের বৃত্তের চারিদিকে দাঁড়িয়ে হাত রাখে বুকে তথা হৃৎপিণ্ডের উপর। এভাবে তারা তাদের টিম তথা দেশের প্রতি আবেগ আর ভালোবাসা প্রকাশ করে। তারা হৃৎপিণ্ড থেকে সাহস সঞ্চয় করে। পরস্পর একাত্ম হয়ে জয়ের জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়। আর ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় সারা বিশ্বের মানুষও একাত্ম হয়ে থাকে।
বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বের মানুষকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে। তা বিশ্বশান্তিতে ভূমিকা রেখেছে বিভিন্ন সময়ে। ১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বৃটিশ এবং জার্মান সৈনিকরা অস্ত্র ফেলে নো ম্যান্’স ল্যান্ডে ফুটবল খেলায় মেতেছিল। ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধ বিরতি পালিত হয় লাগোসে সে সময়ে অনুষ্ঠিত কিংবদন্তি পেলের প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ উপভোগে। একবিংশ শতাব্দীতে আইভরী কোস্টের তারকা ফুটবলার দিদিয়ার দ্রগবা বিশ্বকাপের এক কোয়ালিফাইং ম্যাচে তার আহ্বানের মাধ্যমে সে দেশের গৃহযুদ্ধ থামিয়ে দেন। এভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের এই আয়োজন ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ বিশ্বে নিয়ে আসতে পারে শান্তির বারতা। বিশ্বশান্তির পাশাপাশি বিশ্বকাপের উত্তেজনা ও আবেগ কখনও সংঘাতেরও কারণ হয়েছে। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং পর্বে এল সালভাদর আর হন্ডুরাসের মধ্যকার ম্যাচ দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। ইতিহাসে তা ‘১০০ ঘণ্টার যুদ্ধ’ হিসাবে পরিচিত। এতে কয়েক হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এই সবই ফুটবলের প্রতি আবেগ ও ভালোবাসার বহি:প্রকাশ।
মানবদেহের হৃৎপিণ্ড অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। যে কোন পরিস্থিতিতে তা তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়। হৃৎপিণ্ড উত্তেজনায় দ্রুত চলে, বেদনায় ব্যথিত হয়, রাগে ধপ্ ধপ্ করে আর আতংকে থমকে দাঁড়ায়। বিশ্বকাপের ম্যাচের উত্তেজনাকর মূহূর্তে তা দ্রুত চলবে। এতে বুক ধড়ফড় করতে পারে। প্রিয় দলের জয় কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়ের গোল করা দেখে দেহে সুখী হরমোন নি:সরিত হয়। এতে হৃৎপিণ্ড প্রশান্ত হয়, সৃষ্টি হয় সুখ ও পরিতৃপ্তির অনুভূতি। দল হেরে গেলে তা বেদনায় ব্যথিত হবে। প্রিয় দল কিংবা খেলোয়াড় প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বিক্ষুব্ধ সমর্থকের হৃৎপিণ্ড ধপ্ ধপ্ করবে। এমনকি টুর্নামেন্টের চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তের আতংক যেমন হাই ভেন্টেজ ম্যাচের সনাললি শুরু আউট, টাইব্রেকার, ভিডিও, রিভিও, ভিএআর ইত্যাদিতে হৃৎপিণ্ড থমকে দাড়াতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ফিট তথা অজ্ঞান হয়ে পড়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ক্ষেত্রবিশেষে।
চিকিৎসা শাস্ত্রমতে ফুটবল উত্তম শারীরিক ব্যায়াম। ফুটবল ম্যাচের দৌড়, জকিং ও শরীরের বিভিন্নমুখী গতিবিধি শরীর গঠন, হাড়ের দৃঢ়তা ও হৃৎস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। কিন্তু ম্যাচের শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক চাপ ক্ষেত্রবিশেষে খেলোয়াড়দের হার্ট অ্যাটাক হার্ট ফেইলিউর ও হৃৎপিণ্ডের ছন্দহীনতা জনিত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। হৃৎপিণ্ডের সংবেদনশীল তাই এক্ষেত্রে বিশেষভাবে দায়ী।
প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হওয়া এই বিশ্বকাপ নির্মল আনন্দ উপভোগের এক অনন্য আয়োজন। বিশ্বের ফুটবল প্রেমিরা স্টেডিয়ামে তা সরাসরি উপভোগ করে। আর অন্য বৃহৎ জনগোষ্ঠী ছোট–বড় টিভি পর্দায় তা উপভোগ করে পরিবার পরিজন, বন্ধু–বান্ধব নিয়ে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে তা সমর্থকদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। এই মানসিক চাপ কখনওবা হৃদরোগ সৃষ্টি কিংবা হৃদরোগে আক্রান্তদের ভোগান্তি ও মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিখ্যাত চিকিৎসা শাস্ত্রীয় সাময়িকী নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন এক সমীক্ষায় প্রকাশ করেছে জার্মানীতে অনুষ্ঠিত ২০০৬ বিশ্বকাপ চলাকালে মিউনিখের হাসপাতালে সিসিইউতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে সেখানে জরুরি বিভাগে আগত রোগীর সংখ্যা ছিল অন্য সময়ের তুলনায় তিনগুণ বেশি। অপরদিকে অ্যামেরিকান জার্নাল অব মেডিসিন সতর্ক করে লিখে যে বিশ্বকাপ ফুটবল নিছক এক খেলা নয়। এতে সৃষ্ট চরম উত্তেজনা ও মানসিক চাপ হৃদরোগের কারণ হতে পারে। এই পরিস্থিতি হৃদরোগীদের শারীরিক জটিলতা এমনকি তা হঠাৎ মৃত্যুর কারণও হয় ক্ষেত্রবিশেষে। এতে হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি ও হৃৎপিণ্ডের ছন্দহীনতা সৃষ্টি হতে পারে।
এবারের অধিকাংশ ম্যাচ বাংলাদেশ সময় গভীর রাত ও ভোর বেলায়।
এমতাবস্থায় হৃদরোগীদের তা উপভোগে আপনার একটু সতর্কতা আবশ্যক:
হৃদরোগীর সুস্থ ও নিরোগ শরীরে বিশ্বকাপের উত্তেজনা কোন বিরূপ প্রভাব ফেলা অস্বাভাবিক। তবে হৃদরোগী এবং হৃদরোগের ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের এক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবশ্য পালনীয়:-
১. হার্ট অ্যাটাকের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ রাত জেগে খেলা না দেখাই শ্রেয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম নিশ্চিত করুন।
২. উত্তেজনার আতিসয্য পরিহার করুন। প্রিয়দল কিংবা গোল করা দেখে হঠাৎ চিকৎকার করে থাকুন।
৩. জয় উদযাপন পরিহার করুন। পরাজয়ে অতিমাত্রায় মুষড়ে পড়বেন না।
৪. ধূমপান ছাড়ুন, উত্তেজনার বশে সিগারেটে টান দেওয়া পরিহার করুন। অ্যালকোহল সেবন বন্ধ করুন।
৫. কফি পানে হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। তার পরিবর্তে হালকা চা পান করুন।
৬. হৃৎপিণ্ডের জন্য ক্ষতিকারক ও অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করুন। মচমচে খাবার যেমন চিপ্স, চানাচুর ইত্যাদি ক্ষতিকারক ট্যান্সফ্যাট সমৃদ্ধ। তা পরিহার করুন।
৭. ম্যাচ চলকালীন প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর একটু দাঁড়ান; হেঁটে আসুন। এতে পায়ের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাধা বন্ধ হবে।
৮. কখনও কোন ম্যাচ নিয়ে বেটিং এ যাবেন না।
৯. চিকিৎসক প্রদত্ত ঔষুধ যথাসময়ে, সঠিক মাত্রায় সেবন করুন।
১০. বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়কে অবহেলা করবেন না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
পরিশেষে, নির্মল আনন্দের জন্যই এই আয়োজন। তা আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন। জয় পরাজয় থাকবে; তাকে সহজে গ্রহণ করার চেষ্টা করুন। সুস্থ হৃৎযন্ত্র নিয়ে বিশ্বকাপ খেলা উপভোগ করুন। তাতে কখনওবা বাড়তে পারে আপনার হার্টবিট কিন্তু ফিট্ (অজ্ঞান) কদাপি নয়। হৃদয়ের বিশ্বকাপ উপভোগ করুন সুস্থ হৃদয়ে।












