ব্যাংক হলো একটি শক্তিশালী আমানতকারী প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষের অর্জিত অর্থ জমা রাখবে নিরাপদে। মানুষ সাধ্যমতো নিশ্চিন্তে জমাবে এবং প্রয়োজনের সময় টাকাটা তুলে নেবে। এটা হলো ব্যাংক এবং গ্রাহক এর মধ্যকার সম্পর্ক। এখন নার্গিস আকতার নামের এক গ্রাহক ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক নজু মিয়া হাট শাখায় তার জমানো টাকা তুলতে গেলে বলে ব্যাংকে টাকা নেই। এখন টাকা দেয়া যাবে না। তিনি বিধবা। তিনটি সন্তানের একটি অসুস্থ। এখন কী করবে দিশেহারা। সে রকম বহু নার্গিস আকতার বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা আমানত রেখে আজ ব্যাংকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে, হয়রানি আর বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। আমরা জানি আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকট, উচ্চ খেলাপী ঋণ এবং কাঠামো গত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি কিছু শরীয়াভিত্তিক ব্যাংক আমানত উত্তোলনে চাপের সম্মুখীন। তবে অর্থনীতি পুনরুদ্বারে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিবিড় পর্যবেক্ষণ, নীতি সংস্কার ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সদ্য ঘোষিত বাজেটে দুর্বল ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনে ৩৬,৭০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। চলতি ২৫–২৬ অর্থ বছরে এই খাতে সংশোধন করে করা হয়েছে ৪১ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্বার ও বিনিয়োগ প্রবাহ সচল রাখতে সরকারের মধ্যমেয়াদী কৌশলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন করা এবং এ খাতের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্যে খেলাপী ঋণ হ্রাস, অনুমোদন ও পুনঃ তফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহীতা জোরদার করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য ঝুঁকি ভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পুনঃ মূলধনীকরণ ও ব্যবস্থাপনা সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জনৈক সাবেক নির্বাহী পরিচালক বলেন, ব্যাংকের ক্ষেত্রে আমানতকারীর আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেটাকে আমরা বলি, রেপুটেশনাল রিস্ক। ব্যাংক পরিচালনা অবশ্যই দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে করতে হবে এবং সকলের উচিত এমন কিছু না করা, যাতে আমানতকারীরা আতংকগ্রস্ত হয়ে একই সাথে টাকা উঠিয়ে নিতে চায়। দেশের কথা বিবেচনা করে ব্যাংকিং সেক্টরে স্থিতিশীলতা আনতে সংশ্লিষ্ট সকলকে ভূমিকা রাখতে হবে। তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা, এশিয়ান গ্রুপের ডিএমডি, বিজিএমইএর পরিচালক এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক সাকিফ আহমেদ ছালাম বলেন, ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকট নিরসনে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপী ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা করতে হবে। একই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর তদারকি ও কঠোরভাবে জরুরি ভিত্তিতে বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। নতুন এই ব্যাংক টি রাষ্টায়ত্ত শরিয়াভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে কাজ করবে। এর অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের জন্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার লোকশান দিয়েছে। এ ছাড়াও আরো পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অপসারণ প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আরো কয়েকটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেটে সরকার প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। দেখা যাক, এসব সিদ্ধান্ত কি পরিমাণ কার্যকর হয়, আর গ্রাহকেরা তাদের জমানো টাকা যেন বিনা হয়রানিতে তুলতে পারে, সেটিই প্রত্যাশা। আমরা কিছু দিন আগেও দেখেছি ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করছে, গেটে তালা লাগিয়ে দিয়েছে, অনেককে কান্নাকাটি করতেও দেখেছি। এই সংকট আর জটিলতার দ্রুত অবসান হোক। ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা অচিরেই ফিরে আসুক।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক।











