বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণ মামলায় আসামি মনিরের যাবজ্জীবন

আজাদী প্রতিবেদন | বৃহস্পতিবার , ১৮ জুন, ২০২৬ at ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ

নগরীর বাকলিয়ার চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় আলোচিত চার বছরের শিশু ধর্ষণ মামলায় একমাত্র আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরো ১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল চট্টগ্রাম মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দা হাফসা ঝুমা এ রায় ঘোষণা করেন। ঘটনার ২৬ দিন এবং বিচার শুরুর ৭ কার্যদিবসের মাথায় শিশুর উপর নির্যাতনের এ মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন বিচারক। এসময় আসামি কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন। পরে সাজা পরোয়ানামূলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯ () ধারায় দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানার অর্থ ভিকটিম শিশু পাবে বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন আদালত। আদালত বলেছেন, জরিমানার অর্থ দণ্ডিত আসামির কাছ থেকে বা তার বিদ্যমান সম্পদ থেকে আদায়যোগ্য হবে। তবে উক্তভাবে আদায় করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে তিনি যে সম্পদের মালিক বা অধিকারী হবে সেই সম্পদ থেকে তা আদায়যোগ্য হবে। ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাহমুদউল আলম চৌধুরী (মারুফ) দৈনিক আজাদীকে বলেছেন, চার্জশিটভুক্ত ২২ জন সাক্ষীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে বিচারক এ রায় ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আমাদের আসামির সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রত্যাশিত ছিল। সেই অনুযায়ী আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট। ভিকটিম ন্যায় বিচার পেয়েছে বলে মনে করছি আমরা।

আদালত সূত্র জানায়, এ মামলার মোট সাক্ষী ছিল ২২ জন। এর মধ্যে ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেনবাদী, ভিকটিম, ভিকটিমের মা, নানা, নানী, খালা, তদন্ত কর্মকর্তা, মেডিকেল সার্টিফিকেট রিপোর্ট প্রদানকারী ডাক্তার ও সংশ্লিষ্ট একটি কলোনীর কেয়ারটেকার। এর আগে গত ৮ জুন একই আদালত চার বছরের উক্ত শিশু ধর্ষণ মামলায় পুলিশের দাখিল করা চার্জশিট গ্রহণ করেছিলেন। পরদিন তথা গত ৯ জুন চার্জগঠনের মাধ্যমে আসামি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিলে ১০ জুন থেকে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ আরম্ভ হয়। আদালতসূত্র আরো জানায়, গত রোববার সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হয়। পরদিন সোমবার ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিকে পরীক্ষা করেন বিচারক। এসময় আসামি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। পাশাপাশি তিনি কোন সাফাই সাক্ষ্য দেবেন না মর্মেও জানিয়ে দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার যুক্তিতর্ক শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং শুনানি শেষ করে রায়ের জন্য দিন ধার্য্য করা হয়।

আদালতসূত্র জানায়, এর আগে গত ৪ জুন ঘটনার ১৩ দিন পর ৭ কার্যদিবসের দিন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসিতে থাকা নগর পুলিশের প্রসিকিউশন শাখায় মনির হোসেনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তানভীর আহমেদ। গত ২১ মে বিকালে নগরীর বাকলিয়া থানাধীন চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় চার বছরের শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনাটি ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে তাৎক্ষণিক অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আটক করে। যখন তাকে থানায় নিয়ে যাবে পুলিশ, তখন এলাকার লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। বাধার সম্মুখীন হয় পুলিশ। লোকজন চাইছিল, পুলিশ ধর্ষককে যেন তাদের হাতে তোলে দেয়। তারাই তার বিচার নিশ্চিত করবে। এ নিয়ে পুলিশ ও এলাকার লোকজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। ২ ঘণ্টা চেষ্টা করেও অভিযুক্তকে থানায় নিয়ে যেতে না পেরে পুলিশ সন্ধ্যার দিকে টিয়ার শেল ছোড়ে। ক্ষুব্ধ লোকজনও জড়ো হয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পুলিশের গাড়িতে দেওয়া হয় আগুন। দফায় দফায় সংঘর্ষে রাতভর বাকলিয়া এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। এসময় সাংবাদিকসহ অন্তত ৪০ জন আহত হন। তবে সংঘর্ষের একপর্যায়ে তথা বিদ্যুৎ চলে গেলে পুলিশ অভিযুক্তকে কৌশলে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। তারও আগে ধর্ষণের শিকার শিশুকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। শিশু ধর্ষণে এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নগরীর বাকলিয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ () ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। এছাড়া কাজে বাধা, হামলা ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক একটি মামলা দায়ের করা হয়। গ্রেপ্তার পরবর্তী অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আদালতে উপস্থাপন করা হলে তিনি দোষ শিকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

প্রসঙ্গত, মনির হোসেন কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার ঘারঘাটা এলাকার বাসিন্দা। নগরীর বাকলিয়া এলাকার মিয়াখান নগরে তিনি থাকতেন। ঘটনাস্থল চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় একটি ডেকোরেটরের দোকানে তিনি কাজ কনতেন। এ ডেকোরেটরের দোকানের সামনেই খেলছিল ভিকটিম। সেখান থেকে নিয়ে গিয়েই তাকে ধর্ষণ করেন মনির।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআসামি আবিরের মৃত্যুদণ্ড
পরবর্তী নিবন্ধচমক জাগিয়ে পর্তুগালকে রুখে দিল ডিআর কঙ্গো