বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

| মঙ্গলবার , ১৬ জুন, ২০২৬ at ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ

কোনো কোনো মানুষ সামপ্রতিক সময়ে তার পরিবারের সদস্যদের মতো অতি আপন মানুষের ঘাতক হয়ে উঠছে। উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা। কোথাও জেদের বশবর্তী হয়ে স্ত্রী নির্মমভাবে হত্যা করছেন স্বামীকে, স্বামী মেরে ফেলছেন স্ত্রীকে। আবার সবচেয়ে নিরাপদ যে মায়ের কোল, সেই মা হয়ে যাচ্ছেন সন্তানের হন্তারক; অন্যদিকে সন্তানকে খুন করে পালিয়ে বেড়ান বাবা। ক্ষোভ বা লোভের বশে মাবাবার রক্তে হাত রঞ্জিত করা সন্তানের সংখ্যা আরও বেশি। ভাই মেরে ফেলছে বোনকে, বোন ভাইকে।

গত ১৫ জুন দৈনিক আজাদীতে ‘নিজ ঘরে মামেয়ে খুন’ শীর্ষক প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, আনোয়ারায় নিজ ঘরে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন মা ও মেয়ে। ঘটনার সময় আহত হয়েছেন ৫ বছরের শিশু এক। সে ওই মায়ের সন্তান। গত শনিবার রাত ১১টার দিকে উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি বড়ুয়াপাড়ায় নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন সুজন বড়ুয়ার স্ত্রী এনি বড়ুয়া (৩৬) ও মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। প্রিয়ন্তী মাহাতা পাঠনিকোটা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। আহত অর্ক বড়ুয়া এনি বড়ুয়ার ছেলে। ৯৯৯এ ফোন পেয়ে পুলিশ রাতে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে। পুলিশের ধারণা, পাওনা টাকার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতের স্বজনদের সাথে কথা বলেন। এ সময় নিহত প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার বাড়ির উঠানে বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেয়। পুলিশ সুপার শিক্ষার্থীদের সান্ত্বনা দিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার ও শাস্তির আওতায় আনার আশ্বাস দেন।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে হত্যা, অপহরণ, ডাকাতি, ছিনতাই ও নারীশিশু নির্যাতনের ঘটনা। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে মোট ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পাঁচ ধরনের গুরুতর অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ২২১টি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অপরাধের মামলা দায়ের হচ্ছে দেশের বিভিন্ন থানায়। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, আধিপত্য বিস্তার, আর্থিক সংকট, পারিবারিক বিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতির কারণে অপরাধ পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

তাঁদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধের হার বাড়ছে। নির্বাচনপরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। তাঁরা বলেন,আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়ন এবং অপরাধ দমনে কার্যকর কৌশল দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ছিল, যা যথাযথভাবে হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যাচ্ছে। অনেক ঘটনায় অপরাধীরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নয়, সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গবেষকরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতার পেছনে ব্যক্তি পর্যায়ে অস্থিরতা অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় যেসব মূল্যবোধ রয়েছে, সেগুলো মেনে চললে ব্যক্তি কিংবা পরিবারএই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সহায়ক হবে। অপরাধ বেড়ে যাওয়া, মূল্যবোধের অবক্ষয়এসবের জন্য বেশি দায়ী ঐতিহ্যগত শিষ্টাচারগুলোকে অবজ্ঞা করা। মোটকথা, পারিবারিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে দরকার সুস্থ পারিবারিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক মেলবন্ধন।

দেখা গেছে, যেসব নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটছে সেখানে খুনিরা হয়তো কখনও খুনি ছিল না। এ ক্ষেত্রে আকাশ সংস্কৃতি, প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব ও মাদকের বিস্তারের কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের জিঘাংসা ও মানসিক অস্থিরতা কাজ করে। এর ফলে ব্যক্তি খুনের মতো জঘন্যতম কাজ করতে পিছপা হয় না। কিন্তু এ ধরনের পৈশাচিকতা কখনও কাম্য হতে পারে না। এ বিষয়ে সরকারসহ আমাদের সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে। এ নিয়ে আরও কাজ করতে হবে। সর্বোপরি বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে